
বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টির ছন্দ, আর ভেতরে শব্দের মায়াবী আলপনা। জহির রায়হানের চলচ্চিত্র ও কথাসাহিত্যের অন্তর্লীন সৌন্দর্য নিয়ে আতিক ভাই যখন কথা বলতে শুরু করলেন, তখন বৃষ্টিভেজা সেই দুপুর রূপ নিল এক মুগ্ধকর সাহিত্যক্ষণে। কবি মতিউর রহমান মল্লিকের চেতনায় অনুপ্রাণিত এই মানুষটি তরুণদের হৃদয়ে বুনে দিলেন মানবিকতা ও সৃজনশীলতার বীজ। তাঁর কথায় উঠে এল সাহিত্যের চিরন্তন আহ্বান, সাহিত্য মানুষকে মানবিক করে, আর ভালো কাজের আলো সমাজকে সুন্দর করে।
আতিকুর রহমানের জীবনযাত্রার গল্প কেবল সাফল্যের নয়, এটি অধ্যবসায়, সংগ্রাম ও স্বপ্নের এক দীর্ঘ আখ্যান। ১৯৯১ সালে ১৪ নম্বর নারকেলবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণিতে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। এরপর ইসাহাকাবাদ হোসাইনিয়া আলিম মাদ্রাসা ও ঝালকাঠি কুতুবনগর আজিজিয়া আলিম মাদ্রাসায় দ্বীনি শিক্ষার পাঠ সম্পন্ন করে তিনি এগিয়ে যান সাধারণ শিক্ষার পথে। সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক সম্পন্ন করার পর কৃষির প্রতি আগ্রহ তাঁকে নিয়ে যায় রমজানকাঠি কারিগরি ও কৃষি কলেজে। সেখান থেকে চার বছর মেয়াদি কৃষি ডিপ্লোমা এবং বরিশাল এটিআই থেকে বিএজিএড ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
তাঁর এই পথচলা প্রমাণ করে, স্বপ্নের কোনো একক গন্তব্য নেই। জ্ঞান অর্জনের প্রতিটি ধাপই মানুষকে নতুন সম্ভাবনার দুয়ারে পৌঁছে দিতে পারে। শিক্ষার বিভিন্ন ধারায় বিচরণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের অভিজ্ঞতার পরিধি বিস্তৃত করেছেন, যা তাঁর পেশাগত ও সামাজিক জীবনে বহুমাত্রিকতার সংযোজন ঘটিয়েছে।
২০০১ সাল থেকে ঝালকাঠির অলিগলিতে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মধ্য দিয়ে জ্ঞান বিতরণের যে অভিযাত্রা শুরু করেছিলেন আতিকুর রহমান, তা তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। কলেজজীবন পেরিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অতিথি শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্ত থেকেছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান কার্যক্রমেও।
২০০৫ সালে কলেজের বার্ষিক স্মরণিকায় তাঁর একটি কবিতা এবং শিক্ষা ও গণতন্ত্র শিরোনামের প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর অনুরাগ তখনই প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করে। শব্দের প্রতি ভালোবাসা ক্রমে তাঁকে নিয়ে যায় সংবাদপত্রের জগতে, যেখানে কলম হয়ে ওঠে সমাজ ও মানুষের কথা বলার মাধ্যম।
২০০৭ সালের মে মাসে দৈনিক শাহনামার হাত ধরে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা। পরবর্তী সময়ে সোনার বাংলার জেলা প্রতিনিধি এবং দৈনিক ঝালকাঠি বার্তার স্টার রিপোর্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ সময়, আলোকিত বাংলাদেশ, শতকণ্ঠ, জাগো নিউজ ও দৈনিক সময়ের আলোর মতো গণমাধ্যমে কাজ করেছেন তিনি।
২০২৫ সালের ৩ অক্টোবর থেকে ঐতিহ্যবাহী দৈনিক নয়া দিগন্তের ঝালকাঠি জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আতিকুর রহমান। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় তুলে ধরার মধ্য দিয়ে তিনি নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর এই পথচলায় সাংবাদিকতা কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং সমাজের নানা অসংগতি ও মানুষের কথা তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
সাংবাদিকতার পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে আতিকুর রহমান গ্রহণ করেছেন একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ। ২০১০ সালে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, টিআইবির আয়োজনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের খ্যাতনামা শিক্ষকদের সরাসরি পরিচালনায় দুর্নীতিবিষয়ক চার দিনব্যাপী অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সনদ অর্জন করেন তিনি।
২০১১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেট ভবনে ইন্দোনেশিয়ার একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে পরিবেশবিষয়ক সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে টিআইবির আয়োজনে দুর্নীতিবিষয়ক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পূর্ববর্তী প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা পরীক্ষার অংশ হিসেবে আয়োজিত রিফ্রেশার্স কর্মশালায় অংশ নেন।
প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে সাংবাদিকতার জগতে নিজের দক্ষতা বিকাশের এই প্রচেষ্টা তাঁর পেশাগত নিষ্ঠার পরিচায়ক। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মতো সময়সাপেক্ষ ও দায়িত্বশীল ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তথ্যের গভীরে পৌঁছানো এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় অনুধাবনের প্রতি তাঁর আগ্রহের প্রতিফলন ঘটেছে।
আতিকুর রহমানের পরিচয় কেবল সাংবাদিকতা কিংবা সাহিত্যচর্চার পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানবিকতার চর্চাও তাঁর জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ।
২০১২ সাল থেকে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি স্বেচ্ছায় ২৯ বার রক্তদান করেছেন। একজন স্বেচ্ছা রক্তদাতা হিসেবে তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা মানবসেবার প্রতি নিষ্ঠা ও সহমর্মিতার এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। রক্তের প্রয়োজনে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানে কখনো কখনো একটি পরিবারকে নতুন করে আশার আলো দেখানো। তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন উদ্যোগ প্রমাণ করে, মানবসেবা সব সময় বড় কোনো আয়োজনের অপেক্ষায় থাকে না, বরং একজন মানুষের আন্তরিক সিদ্ধান্তও অন্যের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে একটি উচ্চবিদ্যালয়ে চাকরির পাশাপাশি আতিকুর রহমান বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছেন। রক্তকণিকা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি দেশীয় সাংস্কৃতিক সংসদ, ঝালকাঠি জেলা শাখার পরিচালকের দায়িত্বেও রয়েছেন।
শিক্ষকতা, সাংবাদিকতা, সাহিত্যচর্চা, রক্তদান এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রকে একসূত্রে গেঁথেছে। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনে কাজ করার মাধ্যমে তিনি সমাজের সঙ্গে নিজের সংযোগকে আরও বিস্তৃত করেছেন। তাঁর এই বহুমুখী পথচলা তরুণদের সামনে তুলে ধরে দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠার একটি বাস্তব উদাহরণ।
সেদিনের আয়োজন ছিল নিছক একটি পাঠচক্র নয়, বরং অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের এক সৃজনশীল মিলনমেলা। বাইরে বৃষ্টির অবিরাম ধারা, আর ভেতরে জহির রায়হানের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা। আতিক ভাইয়ের দীর্ঘ কর্মজীবন, সাহিত্যপ্রেম, সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা এবং মানবসেবার গল্প তরুণদের সামনে উন্মোচন করেছিল নতুন এক দিগন্ত।
তরুণ সংগঠক আকাশের আহ্বানে একত্র হওয়া স্বেচ্ছাসেবক ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে সেই আয়োজন হয়ে উঠেছিল অনুপ্রেরণার এক স্মরণীয় অধ্যায়। তাঁরা উপলব্ধি করলেন, সমাজ পরিবর্তনের জন্য কেবল স্বপ্ন দেখাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মননশীলতা, মানবিকতা এবং দায়িত্বশীল কর্মপ্রয়াস। একজন মানুষ তাঁর পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবসেবার মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারেন, আতিকুর রহমানের জীবনপথ তারই একটি উদাহরণ।
বৃষ্টি একসময় থেমে যায়, ভেজা পথ শুকিয়ে আসে, মেঘ সরে গিয়ে আকাশে আলো ফোটে। কিন্তু কিছু মুহূর্ত মানুষের মনে দীর্ঘকাল থেকে যায়। ঝালকাঠির সেই বৃষ্টিভেজা দুপুরও হয়তো তেমনই এক মুহূর্ত, যেখানে সাহিত্যের আলোয় আলোকিত হয়েছিল তরুণদের মন, অভিজ্ঞতার কাছে নতুন করে শিখেছিল তারুণ্য, আর শব্দের ভেতর দিয়ে জেগে উঠেছিল সুন্দর সমাজ গড়ার প্রত্যয়।
কলমের ডগায় সত্যের অনুসন্ধান, হৃদয়ে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ, রক্তদানে মানবতার অঙ্গীকার এবং সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ, সব মিলিয়ে আতিকুর রহমানের জীবনপথ এক বহুমাত্রিক অভিযাত্রার নাম। তাঁর এই দীর্ঘ পথচলা তরুণদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু অর্জনে নয়, বরং জ্ঞানচর্চা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং সমাজের জন্য কিছু করার আন্তরিক প্রচেষ্টায়।
বৃষ্টির সেই দিনে জ্বলে ওঠা সাহিত্যের আলো তাই কেবল একটি আয়োজনের স্মৃতি হয়ে থাকুক, এমন নয়। সেই আলো ছড়িয়ে পড়ুক তরুণদের চিন্তায়, সৃজনশীলতায় ও মানবিক কর্মে। আর আতিক ভাইয়ের অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ হয়ে উঠুক আগামী দিনের পথচলায় অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
