
ক্ষমতায় আসার প্রথম ৬ মাসে নানা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের আলাদা ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছে বিএনপি সরকার। কিন্তু এরই মধ্যে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দখলদারি, সন্ত্রাস ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত এসব অভিযোগের খবর প্রকাশ পাওয়ায় একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিতর্ককে আরও সামনে নিয়ে এসেছে রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে মুখোশ পরা দুই শতাধিক সন্ত্রাসী স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে লুটপাট চালায় এবং পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি পাকা ও তিনটি আধাপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, স্থানীয় বিএনপির দুটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করছিল। হামলার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেডে’র সাইনবোর্ডও টাঙানো হয়। এই হামলা ও দখলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার সংরক্ষিত নারী আসনের সরকার দলীয় সংসদ সদস্য ও মিরপুরের শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হানিফ মিয়াসহ বিএনপির নেতাকর্মী-সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে।
১৯৭৪ সালে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্ন আয়ের মানুষের মাতৃ ও শিশুসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের কার্যক্রম শুরু হয়। শিশুদের টিকাদান, শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছিল সুইডিশ ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থা রাড্ডা বার্নেন নামের প্রতিষ্ঠানটি। ফলে জমি দখলের অভিযোগের পাশাপাশি একটি দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের ঘটনাটি জনস্বার্থের প্রশ্নও সামনে এনেছে।
এমনকি এই জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানটির দখলে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর প্রধান রাষ্ট্রীয় সংস্থা পুলিশের ভূমিকা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন উঠেছে। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, ভাঙচুরের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত ছিল। পরে চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ঘটনাটি প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে; পুলিশের কোনো সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, কোনো দল বা মত দেখা হবে না, অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে।
রাড্ডা সেন্টারের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; কাউকে দলীয়ভাবে দায়ী করার মতো চূড়ান্ত তদন্ত-ফল প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখল ও অপরাধের অভিযোগ নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে।
এদিকে, মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও দখলের বিষয়ে আজ রবিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে তিনি বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনিয়ম, সন্ত্রাস, মাদক ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রাখবে। তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘটনায় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, মিরপুরের রাড্ডা সেন্টারে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় শাহ আলী থানার ওসির দায়িত্বে অবহেলা ছিল। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে হামলায় জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৯ জন গ্রেপ্তার হয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এছাড়া, রাজধানীর ইসিবি চত্বরের ব্রাউনফিশ স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জায়গাজমি নিয়ে পূর্ববিরোধের সম্ভাব্য জের বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সালমান মুক্তাদির কোনো মামলা করেননি; বরং বিএনপির বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। এর বাইরে গুলিস্তানে জাসদের কার্যালয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গোপন বৈঠকের খবর পাওয়ার পর অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৫০ জনকে আটক করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাদের মধ্যে ২৭ জন ছাড়া বাকিদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নাশকতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো অনুমতি ছাড়াই বৈঠক করতে পারে; তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের তথ্য পাওয়ায় ওই অভিযান চালানো হয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্যেও একই অবস্থান উঠে এসেছে। তিনি বলেন, সরকার চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছে। ঢাকায় এক দিনের পুলিশি অভিযানে ৪৭২ জনকে আটক করার তথ্য দেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ও সম্পদ লুটকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন রিজভী।
রিজভী আহমেদ দলীয় অবস্থান ব্যাখ্যা করে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, বিএনপির নাম ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে দল তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। অবৈধ দখলদার ও চাঁদাবাজদের বিএনপি প্রশ্রয় দেয় না এবং এ ধরনের অভিযোগে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকে ইতোমধ্যে দল থেকে বহিষ্কার বা পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
এদিকে মাঠপর্যায়ে অভিযোগের পরিসরও কম নয়। জুনে নারায়ণগঞ্জের বিএনপি এমপির ছেলে ও জেলা যুবদলের এক নেতাকে চাঁদাবাজির একাধিক অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরে পটুয়াখালীর বাউফলে এক বিএনপি নেতাকে এক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে দলীয় পদ ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এসব ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে তদন্ত ও আদালত; তবে দলীয় নেতৃত্বের জন্য ঘটনাগুলো সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অবশ্য পাল্টা যুক্তিও দিচ্ছে। রিজভী বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রাতারাতি শতভাগ স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধের পর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং অপরাধীরা গ্রেপ্তার ও শাস্তির মুখোমুখি হচ্ছে কি না।
এখানেই সরকারের জন্য রাজনৈতিক পরীক্ষাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর বিএনপির কাছে মানুষের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল আইনের শাসন, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে প্রশাসনিক ব্যবস্থা। ফলে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠতে থাকলে তা শুধু সাংগঠনিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ কমে যায়; সরকারের ভাবমূর্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রশ্নও সামনে আসে।
বিশেষ করে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতো একটি প্রতিষ্ঠানে রাতের আঁধারে হামলা, লুটপাট, স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং এরপর সেখানে দখলের দাবিসংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানোর ঘটনা জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে—ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাব কি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণকে ছাপিয়ে যাচ্ছে? আবার পুলিশের উপস্থিতি সত্ত্বেও হামলা ঠেকানো না যাওয়ার অভিযোগ সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে। তদন্তে কারা জড়িত এবং তাদের রাজনৈতিক পরিচয় কী, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে বিএনপি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জটি কেবল চাঁদাবাজি বা দখলদারি বন্ধ করা নয়; ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত, দৃশ্যমান ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নেওয়া। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান যত কমানো যাবে, সরকারের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষাও ততটাই ইতিবাচকভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। আর সেই ব্যবধান থেকেই যদি নতুন নতুন অভিযোগের জন্ম হয়, তাহলে চাঁদাবাজি-দখল-সন্ত্রাসের বিতর্ক বিএনপি সরকারের জন্য ক্রমেই বড় রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: টিডিসি
