
ধানসিঁড়ির বাঁকে শব্দের ফেরিওয়ালা: এক অনন্য বাতিঘর ইসমাইল মুসাফির তিনি কেবল সংবাদপত্রের পাতায় সমাজের অসংগতি তুলে ধরা একজন সাংবাদিকই নন, বরং তার চেয়েও বড় পরিচয়—তিনি হৃদয়ে ধারণ করেন লাল-সবুজের বাংলা আর মননে লালন করেন গভীর সাহিত্য ও সমাজবোধ। বলছি ঝালকাঠির বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, গবেষক ও নির্ভীক সাংবাদিক ইসমাইল মুসাফির-এর কথা।
দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাক্তন এই কৃতী শিক্ষার্থী চাইলেই পারতেন কর্পোরেট দুনিয়ায় নিজেকে হারিয়ে ফেলতে। কিন্তু মাটির টান আর বাংলার প্রতি গভীর ভালোবাসা তাকে ফিরিয়ে এনেছে শিকড়ে। পেশাগত সাংবাদিকতার পাশাপাশি যেখানেই সাহিত্যের ডাক কিংবা সমাজ বদলের ডাক পড়ে, সেখানেই তিনি ছুটে যান এক আত্মিক টানে।
সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত ও সুশাসিত করার লড়াইয়ে তিনি অন্যতম এক অগ্রসৈনিক। ঝালকাঠি জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সনাক (সচেতন নাগরিক কমিটি) সদস্য হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও সামাজিক কর্মকাণ্ড দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে এই অঞ্চলে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সম্প্রতি কবি জীবনানন্দ দাশের স্মৃতিবিজড়িত ঝালকাঠির ধানসিঁড়ি নদীর মোহনায় তরুণ ভলান্টিয়ার আকাশের উদ্যোগে এক ব্যতিক্রমী পাঠচক্রের আয়োজন করা হয়। বিখ্যাত চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক জহির রায়হানের জীবন ও কর্ম নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ইসমাইল মুসাফিরকে।
আয়োজনের দিনটিতে প্রকৃতির রূপ ছিল দারুণ বৈরী। মেঘভাঙা বৃষ্টির তোড়জোড় উপেক্ষা করে, কেবল সাহিত্যের প্রতি অন্তহীন অনুরাগ আর তরুণদের প্রতি অফুরন্ত ভালোবাসার টানে তিনি হাজির হন নদীর মোহনায়। ঝুম বৃষ্টিতে ভিজেও তাঁর কণ্ঠে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি ছিল না, বরং তাঁর চোখ-মুখে ছিল তারুণ্যের দীপ্তি। বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দের সাথে মিলিয়ে তিনি জহির রায়হানের কালজয়ী সৃষ্টি, অন্তহীন সংগ্রাম ও চলচ্চিত্র ভাবনা নিয়ে এমন এক মায়াবী ও তথ্যবহুল আলোচনা গড়ে তোলেন, যা উপস্থিত সবাইকে বিমোহিত করে।
বৃষ্টির মাঝেও ধানসিঁড়ির মোহনায় অনুষ্ঠিত সেই পাঠচক্রটি সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়। উপস্থিত তরুণদের মতে, ইসমাইল মুসাফিরের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনীরা মফস্বলে এসে টিআইবি ও সুজন-এর মতো প্ল্যাটফর্ম থেকে সমাজ সংস্কার ও সাহিত্যের আলো ছড়াচ্ছেন বলেই তরুণ সমাজ এখনো সুপথের সন্ধান পাচ্ছে। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির এই অদম্য কান্ডারি তাঁর কাজের মাধ্যমে আগামী দিনেও ঝালকাঠির বুকে এক অনন্য বাতিঘর হয়ে থাকবেন—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।
