বরিশাল পত্রিকা
www.barishalpatrika.com

বরিশালে ভাড়া নৈরাজ্যে অতিষ্ঠ নগরবাসী: নিজেদের মনমতো ভাড়া বাড়ান অটো, সিএনজি চালকরা

প্রকাশের তারিখ: 17 June 2026, 7:37 pm

ডেস্ক রিপোর্ট :

বরিশাল নগরীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, সিএনজি ও গ্যাসচালিত অটোর ভাড়া নিয়ে চলছে চরম নৈরাজ্য। কোনো সরকারি ঘোষণা, গণশুনানি বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক রুটে ভাড়া বৃদ্ধি করছেন চালকরা। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না থাকায় সাধারণ যাত্রীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ প্রতিদিন অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছেন।

সম্প্রতি নগরীর নথুল্লাবাদ এলাকায় চলাচলকারী একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় চালকদের পক্ষ থেকে তৈরি করা একটি ভাড়ার তালিকা দেখা যায়। সেখানে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তালিকায় বিভিন্ন রুটে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি কোনো সরকারি সংস্থা বা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদিত তালিকা নয়, বরং চালকদের উদ্যোগে তৈরি করা একটি তালিকা, যা এখন যাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

যাত্রীদের অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক মাস আগেও নথুল্লাবাদ থেকে চৌমাথা পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ছিল ৫ টাকা। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে নথুল্লাবাদ থেকে বিএম কলেজ পর্যন্ত ভাড়াও ৫ টাকা থেকে ১০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। নগরীর আরও অনেক রুটে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে।

শুধু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাই নয়, সিএনজি ও নীল গ্যাসচালিত অটোরিকশার ভাড়াও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগে নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল থেকে লঞ্চঘাট পর্যন্ত জনপ্রতি ভাড়া ছিল ১০ থেকে ১৫ টাকা। বর্তমানে একই রুটে যাত্রীদের কাছ থেকে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নগরীর বাসিন্দারা বলছেন, যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষায় কোনো কার্যকর মনিটরিং না থাকায় পরিবহন খাতের একটি অংশ যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। একই দূরত্বের জন্য একেক চালক একেক ধরনের ভাড়া নিচ্ছেন। কোনো নির্ধারিত ভাড়া কাঠামো না থাকায় প্রতিনিয়ত যাত্রীদের সঙ্গে চালকদের বাগ্‌বিতণ্ডা হচ্ছে।

এদিকে ভাড়া নৈরাজ্যের পাশাপাশি বরিশাল নগরীতে অবৈধ ও নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশার সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। অনেক যানবাহনের বৈধ কাগজপত্র নেই। অভিযোগ রয়েছে, বহু চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু-কিশোরদের অটোরিকশা চালাতে দেখা যায়। এসব অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের হাতে প্রতিদিন শত শত যাত্রীর জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

স্থানীয়রা জানান, অনেক চালকই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখেন না। ফলে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, উল্টো পথে চলাচল, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করানো এবং সড়ক নিয়ম অমান্যের ঘটনা অহরহ ঘটছে। এর ফলে ছোট-বড় দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে।

অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। প্রতিদিন হাজার হাজার অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার ফলে জাতীয় গ্রিড থেকে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অনুমোদনহীন চার্জিং স্টেশন ও অনিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ ব্যবহার ভবিষ্যতে আরও বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, বরিশাল নগরীতে অটোরিকশা খাতকে দ্রুত সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা প্রয়োজন। এর জন্য সকল অটোরিকশার নিবন্ধন নিশ্চিত করা, চালকদের লাইসেন্স যাচাই, অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, সরকারি ভাড়া তালিকা প্রণয়ন এবং নিয়মিত তদারকি জোরদার করা জরুরি।

নগরবাসীর দাবি, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে মাঠে নামতে হবে। অন্যথায় ভাড়া নৈরাজ্য, অবৈধ যানবাহনের বিস্তার এবং সড়কে বিশৃঙ্খলা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

বরিশাল পত্রিকা · www.barishalpatrika.com