
মাগরিবের পর বাবার ফোন। ওপাশ থেকে বললেন, ‘মসজিদে মিলাদ দিয়েছি, ১ তারিখে জয়েন দিবি তাই।’ অথচ তখনো নিয়োগপত্র না পাওয়ার কথা বাবাকে বলতে পারেননি ফাহিম। সারা দিন একটু পরপর মা, বাবা, ভাই ফোন করে জানতে চাইছেন—‘কখন দিবে নিয়োগপত্র?’
ভোলা সদরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত আমজাদ হোসেন ফাহিমের জন্য ১ অক্টোবর ছিল নতুন জীবনের শুরু। সেই দিন চাকরিতে যোগ দেবেন—এমন বিশ্বাসে আগেই সেরেছিলেন প্রস্তুতি।
ঢাকায় টিউশনি করিয়ে চলা ফাহিম নিজের শখের সাইকেলটিও ছোট ভাইকে দিয়েছেন, ভেবেছিলেন গ্রামে চলে যাবেন। বইপত্র গুছিয়ে কুরিয়ারে বাড়িতে পাঠানোর প্রস্তুতিও ছিল। আত্মীয়স্বজন ও এলাকার লোকজনও জেনে গিয়েছিলেন, আমজাদ বাড়ি ফিরছেন, তার কাছে পড়তে পাঠাবেন সন্তানদের।
কিন্তু ২৪ সেপ্টেম্বর নিয়োগপত্র বিতরণ শুরু হলে সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি। বরং সামনে আসে নতুন ধাক্কা। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও তার নাম নেই নিয়োগপত্রের তালিকায়।
ফাহিমের দাবি, এনএসআই ও ডিএসবি ভেরিফিকেশনে ‘নেগেটিভ রিপোর্ট’-এর কারণে তাকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কী কারণে এমন প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, সেটি জানেন না তিনি।
ফাহিমের মতোই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েও নিয়োগপত্র না পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন আরও অনেক প্রার্থী। তাদের কেউ বলছেন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে, কেউ বলছেন ভেরিফিকেশনে কী তথ্য এসেছে সেটিই তাদের জানানো হয়নি। ফলে দীর্ঘ আট মাসের অপেক্ষার পর নিয়োগপত্র হাতে না পাওয়ায় হতাশায় পড়েছেন অনেকেই।
শিক্ষিত বেকারদের শেষ আশ্রয়স্থল বলা হয়ে থাকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চাকরিকে। এই চাকরিতে ভেরিফিকেশন করে বাদ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিয়োগবঞ্চিতরা।
দেশের অন্তত ২৭ জেলার হাজারের কাছাকাছি প্রার্থী নিয়োগপত্র পাননি বলে জানিয়েছেন নিয়োগবঞ্চিতরা। এর মধ্যে চাঁদপুরে ২৭, মুন্সীগঞ্জে ৩, শরীয়তপুরে ৬, ঝালকাঠিতে ১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৪, পাবনায় ৩৫, বগুড়ায় ৪৮, সুনামগঞ্জে ১২০, খুলনায় ৫৯, জামালপুরে ৫২, পিরোজপুরে ৪৫, ভোলায় ৮৪ জনসহ বিভিন্ন জেলার প্রার্থীরা রয়েছেন বলে দাবি তাদের।
এদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীকে নিয়োগপত্র প্রদান শুরু হয় ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে। আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে যোগদান এবং ৪ অক্টোবর থেকে পদায়নের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। নিয়োগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন, গোয়েন্দা প্রতিবেদন, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ডোপ টেস্ট ও শিক্ষাগত সনদ যাচাইয়ের মতো বিষয়গুলো বিবেচনার নির্দেশনা রয়েছে।
তবে ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিয়োগবঞ্চিতরা। নিয়োগবঞ্চিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সিয়াম আহমেদের দাবি, ভেরিফিকেশনের সময় বিএনপির কয়েকজন নেতার কাছ থেকে তার বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছিল। তিনি জামায়াতে ভোট দিয়েছিলেন এবং বিষয়টি এলাকায় অনেকে জানতেন। তার ধারণা, রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই হয়তো তিনি বাদ পড়েছেন।
২০২৬ সালের জুনে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগে প্রথমবারের মতো এনএসআই ভেরিফিকেশন যুক্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। এর আগে দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ প্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশন চলছিল।
অথচ সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে প্রশ্ন ও সংস্কারের আলোচনা নতুন নয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন তুলে দেওয়ার সুপারিশ করার প্রস্তাব করেছিল। এরপর ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয় জানার প্রথা বাতিলের সুপারিশের কথাও সামনে আসে।
এসব আলোচনার মধ্যেই ভেরিফিকেশনের পর নিয়োগবঞ্চিত করার বিষয়টি অমানবিক ও বৈষম্যমূলক আচরণ বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থী আব্দুল কাইয়ুমও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তার ভাষায়, যোগ্যতা দিয়ে জীবনের প্রথম চাকরি পাওয়ার পরও ভেরিফিকেশনে বাদ পড়া তার জীবনের ‘সবচেয়ে বড় ট্রমা’। তিনি রাষ্ট্রের কাছে এ বিষয়ে জবাবদিহি দাবি করেছেন।
আরেক প্রার্থী বিল্লাল হোসাইন দীপু জানিয়েছেন, তার বাবা একসময় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি নিজেও বিএনপির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনেও সক্রিয় থাকার কথা জানিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন—কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও তাকে কেন বাদ দেওয়া হলো।
কী বলছে রাজনৈতিক দলগুলো
নিয়োগবঞ্চিতদের অভিযোগকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া এসেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, ‘সুস্পষ্ট ও আইনসম্মত অভিযোগ ছাড়া কোনো প্রার্থীকে নিয়োগ থেকে বাদ দেওয়া হলে তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’ তিনি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া ও নিয়োগবঞ্চনার অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরও এক বিবৃতিতে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ, পরিচয় বা পারিবারিক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে নিয়োগবঞ্চিত না করার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং নেতিবাচক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য কারণ জানানোর দাবি করেছে।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমও ভেরিফিকেশনের নামে প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ তরুণদের ভেরিফিকেশনের নামে বাদ দেওয়া চরম বৈষম্যমূলক, অন্যায্য ও অন্যায় সিদ্ধান্ত। সহস্রাধিক শহীদের রক্তের বিনিময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত বৈষম্যবিরোধী জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণা।
তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে মেধা ও যোগ্যতাই নিয়োগের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা জানিয়ে আপিলের সুযোগ রাখতে হবে।
শিক্ষাবিদ এহসানুল মাহবুব যোবায়ের বলেন, ‘মেধা ও যোগ্যতায় উতরে যাওয়ার পর একজন প্রার্থীকে ভেরিফিকেশনের কারণে বাদ দেওয়া হলে এর সুনির্দিষ্ট কারণ থাকা প্রয়োজন। কেউ ফৌজদারি অপরাধে জড়িত থাকলে বা নিরাপত্তাজনিত কোনো গুরুতর তথ্য থাকলে সেটি ভিন্ন বিষয়। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ বা পারিবারিক পরিচয়ের কারণে কাউকে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়।’
আন্দোলনের ঘোষণা
এদিকে নিয়োগপত্র প্রদানের দাবিতে আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীরা। এ দাবিতে আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে একত্র হবেন তারা। এরই মধ্যে তাদের কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়েছেন ডাকসুর আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক খান জসিম।
যা বলছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘নিয়োগপত্রগুলো ডাকযোগে পাঠানো হয়েছে। এজন্য অনেক এলাকায় সেগুলো পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। এজন্য আমরা যোগদানের তারিখ ১ অক্টোবর পর্যন্ত দিয়েছি। প্রার্থীরা কিছুদিন অপেক্ষা করলে তারাও নিয়োগপত্র পেয়ে যাবেন।’
নতুন করে এনএসআই ভেরিফিকেশনের পর কোনো প্রার্থী বাদ পড়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘কোন প্রার্থী বাদ গেছেন সেটি নির্দিষ্ট করে বলার সময় এখনো হয়নি।
সূত্র: আগামীর সময়
