
মানুষের জন্য কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন নিজের মতো করে। প্রচারের আলোয় নয়, বরং কারও মুখের হাসিতে, কারও বিপদের দিনে বাড়িয়ে দেওয়া সহযোগিতার হাতে তাঁরা খুঁজে নেন জীবনের সার্থকতা। আবির হোসেন রানা তেমনই একজন মানুষ, যাঁর দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে মিশে আছে স্বেচ্ছাসেবা, মানবিকতা, নেতৃত্ব ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ।
২০০৭ সালের দিকে প্রথম আলো বন্ধুসভার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঘূর্ণিঝড় সিডর পরবর্তী মানবিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর স্বেচ্ছাসেবী জীবনের সূচনা। দুর্যোগের ক্ষত বুকে নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষের অসহায়ত্ব তাঁকে শিখিয়েছে, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বড় সামর্থ্যের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একটি সংবেদনশীল হৃদয়ের। সেই উপলব্ধি থেকেই ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে তাঁর মানবিক পথচলা।
পরবর্তীকালে জাগো ফাউন্ডেশনের জাগো সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাধারণ সদস্য হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করেন। ২০০৯ সালের দিকে প্রায় ১০০ জন পথশিশুর হাতে ঈদের পোশাক তুলে দেওয়ার উদ্যোগ ছিল তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায়। যাদের ঈদের আনন্দ অনেক সময় অভাবের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তাদের মুখে হাসি ফোটানোর এই প্রচেষ্টা প্রমাণ করে, মানুষের জন্য করা ছোট একটি উদ্যোগও কারও জীবনে বড় আনন্দ হয়ে উঠতে পারে।
মানুষের কল্যাণে কাজ করার পাশাপাশি সমাজের অসংগতি নিয়েও তাঁর ভাবনা রয়েছে। টিআইবির সচেতন নাগরিক কার্যক্রমের ইয়েস দলের দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আরও গভীর করেছে।
২০২০ সালে ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটি, ইয়াস গঠনের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন আবির হোসেন রানা। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠালগ্নে সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সাল থেকে সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে সংগঠনের কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তরুণদের মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি স্বেচ্ছাসেবার পরিসরকে আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করছেন।
তবে একজন সংগঠক হিসেবে তাঁর পরিচয়ের বাইরেও রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি নতুন প্রজন্মের স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে একজন পরামর্শদাতা ও অনুপ্রেরণার মানুষ।
ইয়াসের স্বেচ্ছাসেবক আকাশ বলেন, আবির হোসেন রানা জুনিয়র স্বেচ্ছাসেবকদের সব সময় কাজের প্রতি উৎসাহিত করেন। ধৈর্য ধরে দায়িত্ব পালন করা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও হাল না ছাড়া এবং নতুন উদ্যোগ নিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করার বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন। তাঁর কাছ থেকে নতুনরা শুধু সাংগঠনিক কাজের অভিজ্ঞতাই নয়, বরং দায়িত্বশীলতা, ধৈর্য ও মানুষের প্রতি আন্তরিকতার শিক্ষাও পায়। একজন অভিজ্ঞ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তিনি নতুনদের এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখান এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরিতে ভূমিকা রাখেন।
আবির হোসেন রানার শিক্ষাজীবন কেটেছে ঝালকাঠি পৌর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও ঝালকাঠি সরকারি কলেজে। সামাজিক কর্মকাণ্ডের ব্যস্ততার বাইরেও গল্প ও উপন্যাস পড়ার প্রতি তাঁর রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। সাহিত্যের প্রতি এই টান তাঁর চিন্তাজগৎকে সমৃদ্ধ করে, মানুষের জীবন ও মনস্তত্ত্বকে কাছ থেকে বুঝতে সাহায্য করে। বইয়ের পাতায় তিনি খুঁজে পান মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি আর সমাজের নানা বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
সাহিত্য মানুষের ভেতরের মানুষটিকে চিনতে শেখায়, আর স্বেচ্ছাসেবা সেই উপলব্ধিকে বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করে। আবির হোসেন রানার জীবনেও যেন এই দুই ধারার এক মেলবন্ধন রয়েছে। একদিকে বইয়ের পাতায় মানুষের জীবনকে জানা, অন্যদিকে বাস্তব জীবনে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এই দুইয়ের সমন্বয় তাঁর ব্যক্তিত্বে যোগ করেছে আলাদা মাত্রা।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মানবিক উদ্যোগের প্রচার দেখা যায়। কিন্তু আবির হোসেন রানার পরিচয়ের বিশেষ দিক হলো, প্রচারের চেয়ে কাজকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা। তাঁর কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো কোনো প্রদর্শনীর বিষয় নয়, বরং নিজের সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধ থেকে করা এক ধরনের মানবিক অঙ্গীকার। যদিও তাঁর কাজের প্রতিটি দিক প্রচারের বাইরে থাকে কি না, তা আলাদাভাবে যাচাইয়ের বিষয়, তবু দীর্ঘদিনের স্বেচ্ছাসেবী সম্পৃক্ততা তাঁর সামাজিক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতার পরিচয় দেয়।
সিডর পরবর্তী মানবিক কার্যক্রম থেকে পথশিশুদের ঈদের আনন্দে শামিল করা, দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা থেকে ইয়াসের নেতৃত্ব, প্রতিটি পর্যায়েই রয়েছে মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা। সময়ের সঙ্গে দায়িত্ব বদলেছে, কাজের পরিধি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের পাশে থাকার প্রত্যয়ই তাঁর পথচলার মূল প্রেরণা হয়ে রয়েছে।
ঝালকাঠির এই মানবিক মুখ আবির হোসেন রানার গল্প তাই কেবল একজন স্বেচ্ছাসেবীর জীবনের গল্প নয়, এটি দায়িত্ববোধ, মননশীলতা ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধের গল্প। যে গল্পে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সমাজের জন্য কাজ করে যাওয়ার নিরন্তর প্রয়াস। কারণ, সব অর্জন পদক বা পরিচয়ে মাপা যায় না, কিছু অর্জন থেকে যায় মানুষের মনে, কারও বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতিতে, আর কারও মুখে ফিরে আসা একটুখানি হাসিতে।
