‘জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামী দিনের নিরাপত্তা’ এই প্রতিপাদ্য এবং ‘এখনই জলবায়ু পদক্ষেপের সময় (Now For Climate)’ স্লোগানকে সামনে রেখে বরিশালে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উদযাপিত হয়েছে। আজ ১০ জুন, সনাক-টিআইবি, বরিশালের উদ্যোগে ছাবেরা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ ও গাছের চারা বিতরণ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা দেশের বর্তমান পরিবেশ বিপর্যয়, তীব্র বায়ু দূষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সাথে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানানো হয়।
স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতার তাগিদ:-
ছাবেরা খাতুন বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুভাষ চন্দ্র সরকারের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। সনাক-টিআইবি, বরিশালের সভাপতি ও অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক টুনু রানী কর্মকারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সনাক-টিআইবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক (অব.) শাহ্ সাজেদা এবং অধ্যক্ষ (অব.) গাজী জাহিদ হোসেন।
বক্তারা বলেন, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু জাতীয় পরিকল্পনা করলেই হবে না, স্থানীয় পর্যায়ে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। অনুষ্ঠানে বিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থী মেহেরিমা সেরনিয়াবাত, ফাইজা আক্তার মনি এবং মিনহা আক্তার পাপড়ী পরিবেশ সুরক্ষায় তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা নিয়ে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরে। এছাড়া পরিবেশ বিষয়ক এসিজি সমন্বয়ক শিউলী সাহা, অ্যাডভোকেট সুভাষ দাস নিতাই, সহকারী প্রধান শিক্ষক রাফিয়া সিদ্দিকা এবং পরিবেশ বিষয়ক উপকমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সেলিনা বেগম আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনা সভা শেষে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর হাতে গাছের চারা তুলে দেয়া হয়।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নীতিমালার সংকট:-
অনুষ্ঠানে টিআইবি কর্তৃক উপস্থাপিত ধারণা পত্রে দেশের জ্বালানি খাতের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়। বর্তমানে বিশ্বব্যাপী মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের ৩০ শতাংশের বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এলেও বাংলাদেশে এই হার এখনো ৫ শতাংশের নিচে। অথচ প্রতি বছর বাংলাদেশ প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার খরচ করে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি করছে, যার ওপর সাম্প্রতিক বৈশ্বিক যুদ্ধ ও সংকটের কারণে আরও ২.২ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত আর্থিক বোঝা চেপেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫ সালে সরকার একটি সবুজ জ্বালানি নীতিমালা তৈরি করলেও দেশে এখনো কোনো আধুনিক, সময়োপযোগী ও সমন্বিত জ্বালানি নীতি নেই。 ১৯৯৬ সালের প্রথম জাতীয় জ্বালানি নীতিটি দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর ফলে দেশের জ্বালানি খাত চরমভাবে আমদানিনির্ভর ও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে। এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে ২০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট আরোপ এবং দেশীয় জীবাশ্ম জ্বালানি লবিস্টদের অনৈতিক প্রভাবের কারণে এই খাতে বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন।
আইনি দুর্বলতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিপর্যয়:-
অনুষ্ঠানে দেশের পরিবেশ আইনের দুর্বলতা ও প্রয়োগহীনতার তীব্র সমালোচনা করা হয়। ২০২৪ সালের পরিবেশ সুরক্ষা সূচকে (EPI) বিশ্বের ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম, যা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। বক্তারা পরিবেশ আদালত আইন ২০১০-এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, বর্তমানে কোনো সাধারণ নাগরিক বা ভুক্তভোগী পরিবেশ আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারেন না। প্রথমে পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে হয় এবং তাদের পরিদর্শকের রিপোর্টের ভিত্তিতেই কেবল মামলা করা যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে ২০০৩ সাল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামে মাত্র ৫৯-২টি মামলা হয়েছে, যা চলমান পরিবেশ অপরাধের তুলনায় একেবারেই নগণ্য।
পাশাপাশি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে দেশের ল্যান্ডফিলগুলো মিথেনসহ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। প্লাস্টিক দূষণ ও অপরিকল্পিত বর্জ্য ফেলার কারণে বর্ষাকালে শহরগুলোতে তীব্র জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া সোলার প্যানেল বা ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যাটারির মতো ই-বর্জ্য (e-waste) ব্যবস্থাপনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন না থাকায় ভবিষ্যতে বড় ধরণের পরিবেশগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
১২ দফা সুপারিশমালা:-
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য টিআইবি’র পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১২টি সুনির্দিষ্ট দাবি ও সুপারিশমালা পেশ করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে দ্রুত সবুজ জ্বালানিতে স্থানান্তরের জন্য একটি সমন্বিত জ্বালানি নীতি তৈরি করা।
২. নবায়নযোগ্য জ্বালানির যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ হ্রাস করা এবং ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দেয়া।
৩. সাধারণ নাগরিকরা যাতে পরিবেশ আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারেন, সেজন্য পরিবেশ আদালত আইন ২০১০ সংশোধন করা।
৪. ই-বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ রোধে ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’ সংস্কার করা এবং দুর্যোগকালীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ প্রোটোকল তৈরি করা।
৫. নদী, খাল, জলাভূমি দখল ও বন উজার বন্ধে বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৬. পরিবেশ ও জ্বালানি খাতের সকল প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক (অব.) টুনু রানী কর্মকার পরিবেশের এই সংকটের হাত থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণ ও তরুণ সমাজকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।