“শিশুশ্রমকে লাল কার্ড দেখাই: শিশুর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করি, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান গড়ি”— এই দৃঢ় প্রত্যয় ও প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বরিশালে পালিত হলো বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস ২০২৬।
আজ ১৪ই জুন বরিশাল নগরীর ৫নং ওয়ার্ড পলাশপুর এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর উদ্যোগে এক আলোচনা সভা ও মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। এই আলোচনা সভায় সমাজের বিশিষ্টজনদের পাশাপাশি অনেক শ্রমজীবী শিশু এবং তাদের পিতা-মাতারাও স্বতঃস্বার্থে অংশ নিয়ে নিজেদের অধিকারের কথা তুলে ধরেন।
টিআইবি বরিশালের এরিয়া কোঅর্ডিনেটর (সিভিক এনগেজমেন্ট) মো: আশফাকুর রহমানের সঞ্চালনায় উক্ত আলোচনা সভায় মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সনাক-টিআইবির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক (অব.) শাহ্ সাজেদা এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ (অব.) গাজী জাহিদ হোসেন। এছাড়া পরিবেশ বিষয়ক এসিজি সমন্বয়ক শিউলী সাহা এবং পরিবেশ বিষয়ক উপকমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সেলিনা বেগম আলোচনায় অংশ নেন।
বক্তারা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)-এর সর্বশেষ জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২-এর ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৭.৮ লাখ শিশু কোনো না কোনো শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে, যার মধ্যে ১০ লাখেরও বেশি শিশু অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লিপ্ত। বিশেষ করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ডাম্পসাইট ও ল্যান্ডফিল থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ এবং প্লাস্টিক, কাগজ বা ই-বর্জ্য আলাদা করার মতো বিপজ্জনক কাজে এই শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কোনো প্রকার সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম (যেমন মাস্ক বা গ্লাভস) ছাড়া কাজ করায় শিশুরা প্রতিনিয়ত বিষাক্ত রাসায়নিক, ধারালো কাচ, ই-বর্জ্য ও মেডিকেল বর্জ্যের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।
আলোচনায় বক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ২০১৩ সালের সরকারি আদেশে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকার পর, ২০২২ সালে বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনাসহ নতুন পাঁচটি খাতকে শিশুদের জন্য নিষিদ্ধ ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তবে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২১-২০ cassettes/২০২৫) থাকা সত্ত্বেও তদারকির অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতার কারণে এই খাতে শিশুশ্রম আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।
নগরীর গৃহস্থালী বর্জ্য সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা প্রাইমারি কালেকশন সার্ভিস প্রভাইডারদের (পিসিএসপি) টেন্ডার ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় শিশুশ্রম নিষিদ্ধের শর্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ে সিটি কর্পোরেশনের কোনো নজরদারি নেই। উপরন্তু, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে শিশুশ্রম ব্যবহারকারী পিসিএসপিগুলোর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, যা সুশাসনের চরম ঘাটতিকে স্পষ্ট করে। এই ব্যর্থতার জন্য বক্তারা স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি কর্পোরেশন এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরকে দায়ী করেন। সভায় বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি আজ আমরা এই শিশুদের ডাম্পিং গ্রাউন্ড থেকে তুলে এনে স্কুলের বারান্দায় না পৌঁছাতে পারি, তবে একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া অসম্ভব। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শিশুশ্রমের এই অন্ধকার অধ্যায় বন্ধ করতে এখনই প্রশাসন ও জনগণকে সম্মিলিতভাবে ‘লালকার্ড’ দেখাতে হবে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে এবং শিশুশ্রম সম্পূর্ণরূপে নির্মূলের লক্ষ্যে টিআইবি প্রণীত ধারণাপত্রের আলোকে সনাক-টিআইবির সদস্যরা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল বারীদের মাধ্যমে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বিলকিস জাহান আক্তার শিরিনের নিকট একটি স্মারকলিপি প্রদান করেন।
স্মারকলিপিতে উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলো হলো:
* বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের জন্য শিশুশ্রম নিরসনের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও বিকল্প কর্মকৌশল অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা দ্রুত হালনাগাদ করা।
* বর্জ্য সংগ্রহে শিশুশ্রম কঠোরভাবে তদারকির জন্য সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাকে ওয়ার্ড-ভিত্তিক বিশেষ ক্ষমতা প্রদান।
* পিসিএসপি নিবন্ধনের শর্তাবলী আরও কঠোর করা এবং শিশুশ্রম আইন লঙ্ঘন করলে লাইসেন্স বাতিল ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধান যুক্ত করা।
* সেকেন্ডারি স্টেশন (STS) এবং ডাম্পিং সাইটগুলো নজরদারির জন্য বিশেষায়িত ‘শিশুশ্রম পর্যবেক্ষণ ইউনিট’ গঠন করা।
* যেকোনো নাগরিক যেন শিশুশ্রমের ঘটনা সরাসরি কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন, সেজন্য একটি ডেডিকেটেড হটলাইন চালু করা।