পদ নয়, মানুষের আস্থাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় -ওয়ালিদ

ক্যাম্পাস রাজনীতিতে শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের পথেই হাঁটতে চান বিএম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন
বরিশালের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের ইতিহাস যেমন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক চর্চার দীর্ঘ ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ, তেমনি সময়ের পরিক্রমায় এই ক্যাম্পাস থেকে উঠে এসেছেন অসংখ্য নেতৃত্ব, যারা পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রতিটি সময়েই নতুন প্রজন্মের কিছু তরুণ নিজেদের চিন্তা, কর্ম এবং নেতৃত্বের মাধ্যমে আলাদা করে পরিচিতি তৈরি করেন। তাঁদেরই একজন ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের (২০২০–২১ সেশন) এই শিক্ষার্থী বর্তমানে সরকারি বিএম কলেজ ছাত্রদলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। তবে তাঁর সঙ্গে দীর্ঘ আলাপচারিতায় সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা হলো—তিনি নিজের পরিচয়কে কোনো পদ বা রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। বরং তিনি বিশ্বাস করেন, একজন ছাত্রনেতার প্রকৃত পরিচয় তাঁর দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতায়।
আলাপের শুরুতেই তিনি বলেন,
“একজন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব শুধু নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তোলা নয়; সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানুষের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে। আমি সবসময় চেষ্টা করি সেই দায়িত্ববোধ নিয়েই পথ চলতে।”
কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠে ছিল আত্মবিশ্বাস, তবে তার চেয়েও বেশি ছিল দায়িত্বশীলতার প্রতিফলন। পুরো কথোপকথনের প্রায় প্রতিটি অংশেই ফিরে এসেছে একটি শব্দ—দায়িত্ব। যেন নেতৃত্বকে তিনি ক্ষমতার নয়, বরং সেবার জায়গা থেকে দেখতে অভ্যস্ত।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পাঠ থেকে বাস্তব রাজনীতির অঙ্গনে
সরকারি বিএম কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক দর্শনের নানা তত্ত্ব প্রতিদিনই তাঁর পাঠ্যসূচির অংশ। কিন্তু তাঁর কাছে রাজনীতি কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় নয়; বরং মানুষের জীবন, অধিকার এবং সমাজের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি অধ্যায়।
তিনি মনে করেন, একজন শিক্ষার্থী যদি দেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র এবং নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না হন, তাহলে তাঁর শিক্ষা পূর্ণতা পায় না। তাই একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র হিসেবেও তিনি ছাত্ররাজনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।

তাঁর ভাষায়,
“ছাত্ররাজনীতি হচ্ছে নেতৃত্ব শেখার প্রথম বিদ্যালয়। এখানে দায়িত্ব নেওয়া শেখা যায়, মানুষের কথা শোনা শেখা যায়, ত্যাগের শিক্ষা পাওয়া যায়।”
যে আদর্শ তাঁকে রাজনীতির পথে নিয়ে এসেছে
ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিনের রাজনৈতিক যাত্রা কোনো আকস্মিক সিদ্ধান্তের ফল নয়। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং রাষ্ট্রচিন্তা তাঁকে আকৃষ্ট করেছে।
তিনি বলেন, তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, বহুদলীয় গণতন্ত্র এবং আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার চিন্তা। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বেগম খালেদা জিয়ার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং বিএনপির চেয়ারম্যান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রচিন্তা তাঁকে ছাত্ররাজনীতিতে সম্পৃক্ত হতে অনুপ্রাণিত করেছে।
তবে তাঁর মতে, রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের সেবা।
“রাজনীতি যদি শুধু ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের জন্য হয়, তাহলে সেটি প্রকৃত রাজনীতি নয়। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সমাজের কল্যাণ এবং দেশ গঠনের দায়িত্ববোধ থেকেই রাজনীতি করা উচিত। আমি সেই বিশ্বাস থেকেই এই পথে এসেছি।”
পদ নয়, শুরুটা ছিল একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে
বর্তমানে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করলেও নিজের শুরুর দিনগুলো ভুলে যাননি।
ওয়ালিদ জানান, সংগঠনে যোগ দেওয়ার সময় তাঁর সামনে কোনো পদ বা পরিচয়ের স্বপ্ন ছিল না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন কর্মীর প্রকৃত পরিচয় তাঁর নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, ত্যাগ এবং সংগঠনের প্রতি আন্তরিকতার মধ্যেই নিহিত।
তিনি বলেন,
“আমি কখনো ভাবিনি কোথায় পৌঁছাব। আমি শুধু চেষ্টা করেছি দায়িত্ব পালন করতে। কঠিন সময়ে সহকর্মীদের সঙ্গে ছিলাম, সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিয়েছি এবং নিজের অবস্থান থেকে সর্বোচ্চটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার কাছে পদ কোনো গন্তব্য নয়; এটি মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিফলন।”
ধীরে ধীরে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করতে করতেই আজ তিনি বিএম কলেজ ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক। তবে এই অর্জনকে তিনি শেষ নয়, বরং নতুন দায়িত্বের সূচনা হিসেবেই দেখেন।

শিক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা, দায়িত্বের পথে নানা চ্যালেঞ্জ
সাধারণ কর্মী থেকে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক—এই যাত্রা যতটা সম্মানের, ততটাই দায়িত্বেরও। ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন মনে করেন, একটি ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে থাকা মানে শুধু কর্মসূচি পরিচালনা করা নয়; বরং শত শত শিক্ষার্থীর প্রত্যাশা, অভিযোগ, স্বপ্ন এবং সংকটের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখা।
তিনি বলেন, “আমার কাছে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয় নয়। এটি শিক্ষার্থীদের দেওয়া আস্থার প্রতিফলন। সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করাই আমার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।”
দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা সংগঠনের কার্যক্রমকে কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁর ভাষায়, ছাত্রসংগঠনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার ওপর।
‘শোনা’ থেকেই শুরু নেতৃত্ব
ওয়ালিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে—তিনি নেতৃত্বের প্রথম শর্ত হিসেবে শোনার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন,
“আমরা অনেক সময় মনে করি নেতৃত্ব মানেই নির্দেশ দেওয়া। কিন্তু আমার বিশ্বাস, নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় শক্তি মানুষের কথা মন দিয়ে শোনা। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে, তখনই সে নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করে।”
এই চিন্তা থেকেই দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই কলেজে অভিযোগ ও পরামর্শ বক্স স্থাপন করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল এমন শিক্ষার্থীদের মতামত সংগ্রহ করা, যারা হয়তো সরাসরি কোনো নেতার কাছে গিয়ে নিজের সমস্যার কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না।
ওয়ালিদের মতে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে একাডেমিক সমস্যা, ক্যাম্পাস-সংক্রান্ত অসুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রত্যাশা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা
নির্বাচনের সময় শিক্ষার্থীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের বিষয়েও তিনি আশাবাদী।
তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর কলেজ প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে। একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষাসেবা-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা এবং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালুর উদ্যোগ তাঁর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমগুলোর একটি বলে তিনি মনে করেন।
তবে তিনি এটিও স্বীকার করেন, সব উদ্যোগ তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
“অনেক বিষয় আছে, যেগুলো আমাদের একার সিদ্ধান্তে করা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া রয়েছে, বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তারপরও আমরা চেষ্টা করি সমস্যাগুলো যথাযথ জায়গায় তুলে ধরতে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে।”

মানবিক কাজেও সক্রিয় থাকার প্রত্যয়
ওয়ালিদের মতে, একটি ছাত্রসংগঠন কেবল রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে তার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া এবং সংকটের সময়ে সহমর্মিতা দেখানোও একজন ছাত্রনেতার দায়িত্বের অংশ।
“মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারলে তবেই নেতৃত্বের মূল্য আছে। শুধু মঞ্চে বক্তৃতা দিলেই নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় না।”
প্রত্যাশার চাপই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী—এই প্রশ্নের উত্তরে ওয়ালিদ কিছুটা ভেবেই উত্তর দেন।
“সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের প্রত্যাশা। শিক্ষার্থীরা চায় তাদের সমস্যা দ্রুত সমাধান হোক। কর্মীরাও চায় সংগঠন আরও সক্রিয় হোক। কিন্তু বাস্তবতার কারণে সবকিছু সঙ্গে সঙ্গে করা সম্ভব হয় না।”
তাঁর মতে, অনেক সময় প্রশাসনিক জটিলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিংবা নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে কাঙ্ক্ষিত কাজ বাস্তবায়নে সময় লাগে। তবুও ধৈর্য, নিয়মিত যোগাযোগ এবং আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হয়।
ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পক্ষে
বর্তমান সময়ে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনার খবর প্রায়ই সামনে আসে। তবে ওয়ালিদ মনে করেন, মতের ভিন্নতা গণতান্ত্রিক সমাজের স্বাভাবিক বিষয়।
“ভিন্নমত থাকতেই পারে। কিন্তু সেই ভিন্নমত যেন কখনো সংঘাতের কারণ না হয়। আমরা চাই একটি শান্তিপূর্ণ, সহনশীল ও শিক্ষাবান্ধব ক্যাম্পাস, যেখানে সব শিক্ষার্থী নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারবে।”
তিনি বলেন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, মানবিকতা এবং সহমর্মিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারলেই ক্যাম্পাসের পরিবেশ আরও ইতিবাচক হবে।
শিক্ষার্থীদের আস্থা—সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি
দীর্ঘ আলাপের এক পর্যায়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় অর্জন কী?
ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিনের উত্তর ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ।
“আমার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন কোনো পদ নয়। যদি একজন সাধারণ শিক্ষার্থী বিশ্বাস করে যে প্রয়োজনের সময় আমি তার পাশে দাঁড়াব, সেটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
পড়াশোনা, নেতৃত্ব ও স্বপ্ন—একজন ছাত্রনেতার ব্যক্তিগত দর্শন
একজন ছাত্রনেতার কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি—রাজনীতি আর পড়াশোনা কি পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব? অনেকের মতে, সাংগঠনিক ব্যস্ততা একাডেমিক জীবনে প্রভাব ফেলে। আবার কেউ মনে করেন, সময় ব্যবস্থাপনা জানলে দুটি ক্ষেত্রেই সফল হওয়া সম্ভব।
ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিন দ্বিতীয় মতের পক্ষেই দাঁড়ান। তাঁর মতে, একজন ছাত্রনেতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত তিনি একজন শিক্ষার্থী। সেই পরিচয়কে অক্ষুণ্ন রেখেই নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করতে হয়।
তিনি বলেন,
“সময় ব্যবস্থাপনাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমি সবসময় চেষ্টা করি পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সংগঠনের দায়িত্বও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে।”
তবে তিনি স্বীকার করেন, অতীতের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর শিক্ষাজীবনকে কিছুটা প্রভাবিত করেছে।
“বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে ছাত্রদলের একজন কর্মী হওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমার একাডেমিক কার্যক্রম কিছুটা বিঘ্নিত হয়েছিল। এখন চেষ্টা করছি রাজনীতির পাশাপাশি সেদিকেও সমান গুরুত্ব দিতে। কারণ একজন ছাত্রনেতা যদি নিজেই শিক্ষাজীবনে সফল না হন, তাহলে অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হওয়া কঠিন।”

‘নেতৃত্ব মানে দায়িত্ব’
ওয়ালিদের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপের পুরোটা জুড়ে একটি বিষয় সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে—তিনি নেতৃত্বকে কখনো ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে দেখেন না।
বরং তাঁর ভাষায়,
“নেতৃত্ব মানে সবার আগে দায়িত্ব নেওয়া। নেতৃত্ব মানে মানুষের কথা শোনা, সংকটে পাশে দাঁড়ানো এবং নিজের চেয়ে অন্যের প্রয়োজনকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া।”
একজন আদর্শ ছাত্রনেতার কী গুণ থাকা উচিত—এই প্রশ্নে তিনি বলেন,
“আমার কাছে একজন আদর্শ ছাত্রনেতা সেই ব্যক্তি, যিনি আগে একজন ভালো মানুষ। যার মধ্যে সততা, সাহস, বিনয়, ত্যাগের মানসিকতা এবং মানুষের কথা মন দিয়ে শোনার ক্ষমতা থাকবে। নেতৃত্ব কখনো অহংকারের বিষয় নয়; এটি জবাবদিহির একটি জায়গা।”
চারটি মূল্যবোধে বিশ্বাস
ব্যক্তিগত জীবনেও কিছু নীতিকে তিনি সবসময় অনুসরণ করার চেষ্টা করেন।
সততা, দায়িত্ববোধ, মানবিকতা এবং দেশপ্রেম—এই চারটি শব্দই তাঁর কাছে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তিনি বলেন,
“মানুষকে পদ দিয়ে নয়, চরিত্র দিয়ে মূল্যায়ন করা উচিত। পদ একদিন থাকবে না, কিন্তু একজন মানুষের ব্যবহার, সততা এবং কর্মই তাকে মানুষের মনে বাঁচিয়ে রাখে।”
স্বপ্ন শুধু রাজনীতি নয়, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়েও
বিএম কলেজের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ওয়ালিদের চোখে আলাদা উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
তিনি চান, কলেজটি শুধু ঐতিহ্যের জন্য নয়, শিক্ষার মান, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশের দিক থেকেও দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হোক।
তাঁর স্বপ্নের তালিকায় রয়েছে—
ক্যারিয়ার অ্যান্ড স্কিল ডেভেলপমেন্ট সেল,
উচ্চশিক্ষা ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স ডেস্ক,
জরুরি শিক্ষার্থী সহায়তা তহবিল,
নবীন শিক্ষার্থীদের জন্য মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম,
প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষা-সহায়ক ব্যবস্থা।
তিনি বলেন,
“আমি চাই ছাত্রসংগঠন শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকুক। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনেরও একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হোক। একজন শিক্ষার্থী যেন শুধু একটি ডিগ্রি নয়, দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং নেতৃত্বের গুণ নিয়েও কলেজ থেকে বের হতে পারে।”
ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্যরকম ভাবনা
অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে নির্দিষ্ট পরিকল্পনার কথা বলেন। কিন্তু ওয়ালিদের উত্তর ছিল কিছুটা ভিন্ন।
তিনি বলেন,
“আমি ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব বেশি পরিকল্পনা করি না। মানুষ মরণশীল। কখন, কোথায় এবং কীভাবে জীবনের সমাপ্তি হবে, তা একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। তাই আমি পদ নয়, প্রতিটি দিন যেন সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে পারি, সেই চেষ্টাই করি।”
কিছুক্ষণ থেমে তিনি আরও যোগ করেন,
“আমার একটাই প্রত্যাশা—যেদিন এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেব, সেদিন মানুষ যেন আমাকে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এবং দোয়ার সঙ্গে স্মরণ করে। যদি একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে মানুষের হৃদয়ে সামান্য জায়গাও করে নিতে পারি, সেটাই হবে আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”

নতুন প্রজন্মের প্রতি বার্তা
ছাত্ররাজনীতিতে আসতে আগ্রহী নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর পরামর্শও বেশ স্পষ্ট।
“প্রথমে নিজেকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন। পড়াশোনাকে গুরুত্ব দিন। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকুন। রাজনীতিকে কখনো ব্যক্তিগত লাভের মাধ্যম হিসেবে নয়, মানুষের সেবার একটি মহৎ দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করুন। আদর্শ, শৃঙ্খলা ও ত্যাগ ছাড়া প্রকৃত নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় না।”
শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে
আলাপের শেষদিকে কলেজের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের উদ্দেশে নিজের বার্তা তুলে ধরেন ওয়ালিদ।
তিনি বলেন,
“শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নৈতিক মূল্যবোধ এবং দেশপ্রেম ধারণ করে নিজেকে একজন যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আমাদের শিক্ষকরা শুধু পাঠদান করেন না, তাঁরা আমাদের পথপ্রদর্শক। আর অভিভাবকদের প্রতি আমার অনুরোধ, সন্তানদের শুধু ভালো ফলাফলের জন্য নয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে উৎসাহিত করুন। আমরা সবাই যদি নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল হই, তাহলে আমাদের কলেজ, সমাজ এবং বাংলাদেশ অবশ্যই আরও সুন্দর ও সমৃদ্ধ হবে।”

শেষকথা
কথোপকথন শেষে ওয়ালিদ বিন সালাউদ্দিনকে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে আসার সময় মনে হচ্ছিল, তাঁর কথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ছিল—দায়িত্ব।
রাজনীতির উত্তাপ, সাংগঠনিক ব্যস্ততা কিংবা নেতৃত্বের আলোচনার ভিড়েও তিনি বারবার ফিরে গেছেন মানুষের কাছে, শিক্ষার্থীদের কাছে, দায়িত্বের কাছে।
ভবিষ্যতে তাঁর পথচলা কোন দিকে যাবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নিজের ভাষায় তিনি যে পরিচয়টি সবচেয়ে বেশি ধারণ করতে চান, সেটি কোনো পদবির নয়; একজন দায়িত্বশীল, মানবিক এবং শিক্ষার্থীদের আস্থার জায়গা হয়ে ওঠা মানুষের।
আর হয়তো এ কারণেই তাঁর একটি বাক্য দীর্ঘ আলাপের পরও মনে থেকে যায়—
“পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও বিশ্বাসই একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।”










