আকাশ, ঝালকাঠি প্রতিনিধি।
ঝালকাঠির তরুণ সমাজকর্মী মোঃ সাব্বির হোসেন রানা নিজের কর্মপ্রচেষ্টা, মানবিক দায়বদ্ধতা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ঝালকাঠিতে গড়ে তুলেছেন আলাদা পরিচিতি। ব্যক্তিগত জীবন, পেশাগত দায়িত্ব এবং সমাজসেবাকে একসঙ্গে ধারণ করে তিনি হয়ে উঠেছেন তরুণ প্রজন্মের অনুপ্রেরণার নাম।
পরিচিতি
মোঃ সাব্বির হোসেন রানার বয়স ২৯ বছর। তার বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দিয়াকুল গ্রামে। তিনি উচ্চশিক্ষিত একজন তরুণ। বরিশালের বিএম কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএসএস এবং ঝালকাঠি সরকারি কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে বিএসএস সম্পন্ন করেছেন।
বর্তমানে তিনি ইউএনডিপি ও ভূমি রেকর্ড জরিপের ভূমি অটোমেশন প্রকল্পে ডাটা এন্ট্রি অপারেটর (ডিইও) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
শুরুর গল্প
সামাজিক ও মানবিক কাজে তার পথচলা শুরু হয় ঝালকাঠির স্থানীয় সংগঠন “জাগো হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন”-এর মাধ্যমে। সংগঠনটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি “প্রথম আলো বন্ধুসভা, ঝালকাঠি”-তে কাজ করেন।
পরে বিভিন্ন সংগঠনে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনজন তরুণের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন “ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটি (ইয়াস)”। পরবর্তীতে আরও অনেকে যুক্ত হলে সংগঠনটি ঝালকাঠির একটি পরিচিত সামাজিক সংগঠনে পরিণত হয়।
শৈশবের দিনগুলো
গ্রামের মাটিতে বেড়ে ওঠা রানার শৈশব কেটেছে দুষ্টুমি আর খেলাধুলায়। বাড়ির বড় উঠোনে সমবয়সীদের সঙ্গে ক্রিকেট, মাঠে-ঘাটে ছুটে বেড়ানো, সুগন্ধা নদীর চরে সাঁতার কাটা, কাদা ছোড়াছুড়ি, পানিতে নানা খেলা—এসবই ছিল তার ছোটবেলার আনন্দঘন সময়।
এছাড়া দাদা-দাদির বাড়িতে গিয়ে খেজুর রস খাওয়া, ধান কাটার মৌসুমে মাঠে যাওয়া, দাদার সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া—এসব স্মৃতি আজও তাকে নাড়া দেয়।
স্বপ্ন ও বাস্তবতা
ছোটবেলায় অনেকের মতো তিনিও বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। তবে তিনি মনে করেন, সঠিক দিকনির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে অনেক তরুণ পিছিয়ে যায়, বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবার থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীরা।
কাজের প্রেরণা
সামাজিক কাজের আগ্রহ এসেছে বড় ভাই-বোনদের দেখে। তিনি জানান, ফারজানা আপু, রানা ভাই, বাপ্পি ভাই ও শাকিল রনি ভাইদের দেখে সমাজসেবায় উদ্বুদ্ধ হন। এরপর থেকেই এই কাজের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন।
তার ভাষায়, “ছুটতে পারছি না, ছুটতে চাইও না।”
সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জ
জীবনের পথে তাকে আর্থিক সংকট, পারিবারিক চাপ ও সামাজিক নানা বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। পরিবার সবসময় চেয়েছে তিনি বড় চাকরিতে প্রতিষ্ঠিত হোন। তাই সামাজিক কাজে সময় দেওয়ার বিষয়ে কখনও কখনও আপত্তি থাকলেও ভালো কাজের স্বীকৃতি দেখলে পরিবারও তাকে উৎসাহ দিয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনে বাধা থাকবেই, কিন্তু থেমে গেলে চলবে না।
বর্তমান কাজ ও উদ্যোগ
ভালো চাকরির প্রত্যাশা নিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছেন এবং অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছেন। ব্যবসার প্রতি আগ্রহ থাকলেও আপাতত সে পথে এগোচ্ছেন না। তবে সামাজিক কাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
তিনি জানান, কতজন উপকৃত হয়েছেন তা কখনও হিসাব করেননি। তবে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সমাজে অবদান
সাব্বির হোসেন রানার সমাজসেবামূলক কাজের পরিধি বেশ বিস্তৃত। এর মধ্যে রয়েছে—
অসহায় মানুষের সহায়তা
সেলাই মেশিন বিতরণসহ স্বাবলম্বী প্রকল্প
বিনামূল্যে চক্ষু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প
রক্তদান ও রক্ত সংগ্রহে সহায়তা
খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি
শিক্ষা সামগ্রী বিতরণ
স্কুলে কুইজ প্রতিযোগিতা আয়োজন
দক্ষতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক কর্মসূচি
বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ রক্ষা কার্যক্রম
জলবায়ু সচেতনতা ও সামাজিক উদ্যোগ
তিনি নিজে ১২ বার রক্তদান করেছেন।
সাফল্য ও অর্জন
নিঃস্বার্থ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বিভিন্ন সংগঠন থেকে একাধিক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
সেরা সদস্য সম্মাননা
সেরা বন্ধু সম্মাননা
রক্তযোদ্ধা সম্মাননা
বিভিন্ন শুভেচ্ছা স্মারক
সমাজে পরিচিতি
নিজেকে নিয়ে প্রচার না করলেও ঝালকাঠিতে একজন সক্রিয় সামাজিক কর্মী হিসেবে অনেকেই তাকে চেনেন। বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তিনি সহযোগিতার চেষ্টা করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তরুণদের জন্য বড় স্বপ্ন রয়েছে তার। তিনি চান, শিক্ষার্থীরা যেন তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সঠিক পথ খুঁজে পায়। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে শিশু-কিশোরদের দক্ষতা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী এগিয়ে নিতে কাজ করতে চান।
তরুণদের জন্য বার্তা
১. ক্যারিয়ার: দক্ষতার বিকল্প নেই
শুধু সনাতন ডিগ্রির ওপর নির্ভর না করে কারিগরি ও ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করতে হবে। প্রযুক্তির যুগে নিজেকে নিয়মিত আপডেট রাখতে হবে।
২. সামাজিক কাজ: পরিবর্তনের শুরু নিজের হাতে
সমাজের সমস্যা নিয়ে অভিযোগ না করে সমাধানে অংশ নিতে হবে। ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
৩. রাজনীতি: সচেতনতা ও আদর্শ
রাজনীতি মানে শুধু মিছিল নয়; দেশের ইতিহাস, অর্থনীতি ও নীতি সম্পর্কে সচেতন হওয়াও রাজনীতি। সঠিক ও ভুলকে আলাদা করার ক্ষমতা রাখতে হবে।
মূল কথা
এগিয়ে যাওয়ার জন্য শর্টকাটের পেছনে না ছুটে সততা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে সঙ্গী করতে হবে। ব্যক্তিগত উন্নয়নই একসময় দেশের উন্নয়নে রূপ নেয়।
উপসংহার
মোঃ সাব্বির হোসেন রানা প্রমাণ করেছেন, বড় পরিবর্তনের জন্য বড় পদ নয় দরকার বড় মন ও মানবিক মানসিকতা। স্বপ্ন, সংগ্রাম ও সমাজসেবায় এগিয়ে চলা এই তরুণ নিঃসন্দেহে ঝালকাঠির গর্ব এবং তারুণ্যের অনুপ্রেরণা।