ইমরান হোসেন রাহাত খান
৬ এপ্রিল ২০২৬, ৮:৫০ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

”সংহতি বৈশাখ”

সংহতি বৈশাখ

ইমরান হোসেন রাহাত খান-

অস্ট্রিক-দ্রাবিড় আদিম প্রহরে জাগিল যে সুর-বীণ,
প্রকৃতি-বন্দনা-রসে সিক্ত ছিল সে অনাদি দিন।
সূর্য-অগ্নি-বারিধারার সনে ফসলের আরাধনা,
বাঙালির হৃদে অঙ্কিত ছিল শাশ্বত আলপনা।

আকবর শাহ টানিল যে ভাই ফসলি সনের ডোর,
খাজনা দিতে চাষার মনে ফুটল রঙিন ভোর।
নৃপতি ও প্রজা মিলনে নামিল বৈশাখী জয়গান,
জীর্ণ প্রথাও উৎসবে পেল মুক্তির পরম ত্রাণ।

গ্রাম-বাংলার মেলায় মেলায় রঙিন শাড়ির ছটা,
মায়েদের মাথায় ঘোমটা খানি— অপরূপা এক ঘটা।
পায়েতে আলতা, নূপুর-নিক্কণ, হাতে রেশমি চুড়ি,
পাহাড়ি ঝর্ণার কলতানে যেন খুশির রঙিন ঘুড়ি।

কপালে লাল টিপ আর হাতে শঙ্খ-চুড়ির হাসি,
বাঁশের বাঁশিতে বাজে সুরে মধুর বারোমাসি।
গরম জিলিপি, রসাল মুড়লি, মচমচে গজা-খই,
মাটির সানকিতে ঘন পায়েস আর পাতিল ভরা দই।

আতর-গোলাপের ম ম ঘ্রাণে মুখর চারিপাশ,
বড়দের পায়ে সালাম ঠুকে কাটে খুশির বারো মাস।
তপ্ত দুপুরে ডাবের জল আর বেলের শরবত খানি,
তৃষ্ণা মেটায় প্রাণের উৎসবে— এ যেন অমৃত বাণী।

বায়োস্কোপে দেশ-বিদেশের রঙের কারসাজি,
মাটির ব্যাংক আর শোলার পাখিতে শৈশব হয় রাজি।
কুস্তি লড়াই আর বীরের বেশে লাঠি খেলার দাপট,
হৃদয় নাচে ঢাকের তালের বলীয়ান জাদুকপট।

পাটের শিকা, ডালি-কুলা আর বাঁশের ঝুড়ির কাজ,
মায়েদের হাতের আলপনাতে সাজে মেলার সাজ।
ঝালমুড়ি আর আচারের ঘ্রাণে জিভে আসে জল,
পান্তা-ইলিশের কাঁচা লঙ্কা— ঐতিহ্যের এই বল।

মাটির সরায় রঙের কাজ আর লক্ষ্মীর ওই হাঁড়ি,
শোলার কদম ফুলের গন্ধে সাজে মেলার বাড়ি।
রঙিন বেলুন ওড়ে আকাশে, হাতে তালপাতার পাখা,
শৈশবের সেই দিনগুলি সব হৃদয়ে আছে আঁকা।

সার্কাসের ওই জাদুর খেলা, মরণকূপের টান,
মোটরসাইকেল চক্কর দেয়— থমকে সবার প্রাণ।
কাঁসা-পিতলের বাসন ভাণ্ড, মাটির সরা চিত্র,
নকশিকাঁথার ভাঁজে ভাঁজে গভীর প্রেমের মিত্র।

নাগরদোলার চক্কর ঘোরে, কলিজা করে দুরুদুরু,
ঐকতানের সুর লহরী মেলার গহীন শুরু।
পিঁপড়ে-পুতুলের নাচন দেখে ছোটদের মনে ধক,
চরকি ঘোরে সাঁইসাঁই করে, নেইকো কোনো থক।

মাঠের কোণে কাদা খেলা আর রঙিন চরকির মেলা,
মুড়লি-কদমা-গজা-বাতাসায় কাটে সারাবেলা।
চিড়া-মুড়ির মোয়া আর মচমচে সেই নিমকি,
মাঠের ধুলোয় শৈশব নাচে— নেইকো কোনো ধমকি।

মাটির ব্যাংকে জমানো কড়ি, তালপাতার ওই বাঁশি,
সাঁতার লড়াই, লাঠি খেলায় গ্রাম্য বীরের হাসি।
কাঠের ঘোড়া, রঙিন পাখা, শোলার তৈরি পাখি,
মেলার ধুলোয় স্মৃতিরা সব দিচ্ছে যেন উঁকি।

কাঁচের চুড়ির রিনঝিন শব্দে মুখরিত চারিপাশ,
শোলার পাখির ডানায় ওড়ে বাঙালির নীল আকাশ।
ঢাক-ঢোলের ওই গুরুগুরু নাদে গ্রাম-শহর মুখর,
নাগরদোলা ঘোরে শোঁ-শোঁ রবে, তুঙ্গে খুশির ঝড়।

আকাশ পানে হাত বাড়িয়ে ঘুরছে নাগরদোলা,
ছোট-বড় সবার মনে আনন্দ বাঁধভাঙা খোলা।
পুতুল নাচের ছন্দে ঘোরে স্বপ্নের সেই মায়া,
বটের ছায়ায় জিরিয়ে নিতে শান্ত শীতল কায়া।

পান্তা-ভর্তা আর শুঁটকির ঘ্রাণে ম ম করে পাড়া,
মাটির সানকি হাতে বাঙালি আজ খুশিতে আত্মহারা।
নাটাই-ঘুড়ির সুতো কেটে যায় দূর অজানার পানে,
পিঠা-পুলির ঘ্রাণ মিশে যায় বৈশাখী সব গানে।

দই-মিষ্টির হাঁড়ি হাতে গাঁয়ের পথে হাঁটা,
মেলার শেষে শান্তি বিলায় কলার মোচার ছাঁটা।
দূরের গাঁ থেকে ফকির-দরবেশ গাহে যে সাম্যের সুর,
একতারাতে বাজে সে গান, মন হয় সুদূর।

মেলার শেষে বাড়ি ফিরে দেখি পায়ের পায়েস-রসে,
সবার মুখে হাসি ফুটেছে নতুন আশার বশে।
নৌকা বাইচে দাঁড়ের টানে কাঁপিল গহীন থর,
বাঁশের বাঁশির মিষ্টি সুরে মেলা প্রাঙ্গণ মায়ায় বিভোর।

ভাটিয়ালি সুর, বাউলের গান আর ভাওয়াইয়ার তান,
মেঠো পথে জাগে মাটির গন্ধে বাঙালির জয়গান।
হালখাতার ওই নতুন পাতায় মিষ্টিমুখের ঘটা,
ব্যবসার ঘরে খাতা খুলে হাসে লাল-সবুজের ছটা।

মেলাতে লড়াই— ষাঁড়ের লড়াই, হাডুডু আর দাপট,
পুরষেরা ভাঙে হাঁড়ি লয়ে হাতে রণজয়ী ঝাপট।
মা-বোনেদের সেই বালিশ লুকানো, হাসির কলতান,
মাটির হাঁড়ি আর কারুকাজে জাগে ঐতিহ্যের প্রাণ।

এই মেলাতেই শিখিয়াছে জাতি— হইব না কভু নত,
সংহতি জোরে জয় করি মোরা বাধা ও বিপত্তি যত।
বায়ান্নতে শোণিত দিয়াছি, চুয়ান্নতে জয়,
চৌষট্টি আর ছেষট্টিতে ঘুচিল মনের ভয়।

হঠাৎ আকাশ মেঘলা করে আসে কালবৈশাখী ঝড়,
উড়িয়ে নেয় সব জীর্ণ-পুরানো, কাঁপায় অম্বর।
অন্যায়ের ওই প্রাসাদ ভেঙে হয় সে চুরমার,
নতুন ভোরে জাগে পৃথিবী— ঘুচে যায় হাহাকার।

ঊনসত্তরের গণজাগরণ, একাত্তরের রণ,
মুক্তির বীজ বুনেছি মোরা বৈশাখী ওই ক্ষণ।
চব্বিশের সেই ছাত্র-জনতার বজ্রকঠিন নাদ,
ঐক্যবলেই চূর্ণ করেছি স্বৈরাচারের খাদ।

পাহাড়েতে জাগে ‘বৈসাবি’র নাচে বারি-কেলির কলতান,
নৃতাত্ত্বিক বিভেদ ভুলিয়া গাহিছে একতার গান।
নৃপতি ও ভিক্ষুক, হিন্দু ও মুসলিম— নাই কোনো ভেদাভেদ,
নবীন আলোকে প্রশমিত হউক ধরণীর সব খেদ।

যেমন বর্ষা প্রক্ষালন করে এই ধরণীর ধূলি,
তেমনি বৈশাখ মুছিয়া দিক জরা ও শৃঙ্খলগুলি।
নবীন আলোর পত্রপল্লবে কালজয়ী এই সুর,
চৌদ্দশ তেত্রিশে বিনাশ হউক সকল আঁধার-ঘোর।

শুদ্ধ হয়ে বাঁচুক মানুষ, জাগুক মুক্ত প্রাণ,
বৈশাখী ওই রুদ্র ঝড়ে উড়ুক বিজয়ী নিশান!

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বরিশাল-ঝালকাঠি মহাসড়কে দুর্ঘটনায় কাউন্সিলর সাগর নিহত, গুরুতর আহত থাই সোহেল

ধানসিঁড়ি ইউনিয়নে ফকিরহাট-বিলারবাড়ি সড়কের বেহাল দশা, দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে চরম দুর্ভোগ

ঝালকাঠিতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নামে লুটপাট: আকলিমা মোয়াজ্জেম হোসেন কলেজে উন্নয়নের নামে গায়েব লাখ লাখ টাকা

ববিতে ছাত্র অধিকার পরিষদের ৩ মাসের আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন

ইউজিসির অর্থায়নে সংস্কার হচ্ছে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বালুর মাঠ

ঝালকাঠিতে অটোরিকশার দাপট: তীব্র যানজটে স্থবির জনজীবন

বিজন বেপারীর কবিতা “নতুন আশা”

পিরোজপুরে ক্লাস চলার সময় শিক্ষার্থীর মাথায় ভেঙে পড়লো ফ্যানের পাখা

তালতলীতে তিন গ্রাম নদী ভাঙ্গনরোধে মানববন্ধন

নম্বরবিহীন মোটরসাইকেলে তেল নিতে গিয়ে ইউএনওর হাতে কারারক্ষী আটক

১০

”সংহতি বৈশাখ”

১১

কলাপাড়ায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদত্যাগের দাবিতে কক্ষে তালা শিক্ষকদের

১২

আমতলীতে বাসচাপায় এক ব্যক্তি নিহত

১৩

বাবুগঞ্জে একযোগে ৫ ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বদলি

১৪

​ঝালকাঠির সেরা তরুণী খোঁজার লড়াই: শুরু হচ্ছে ‘অনন্যা ঝালকাঠি প্রতিযোগিতা-২০২৬

১৫

“জুমার দিন”

১৬

ঝালকাঠিতে ইনসাফ যুব পাঠাগারে শতাধিক বই প্রদান করলেন কবি মুন্সি বুরহান মাহমুদ

১৭

ঝালকাঠিতে ইয়ুথ অ্যাকশন সোসাইটি (ইয়াস)-এর উদ্যোগে বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও সচেতনতা কর্মসূচি

১৮

বরিশালে ফুটপাত দখলমুক্তে কঠোর নগর প্রশাসন, দখলকারীদের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা

১৯

ঝালকাঠির বাসন্ডা ব্রিজ এখন মরণফাঁদ: সংস্কারের নামে প্রহসন ও জনজীবনে চরম নাজেহাল অবস্থা

২০