ইমরান হোসেন
৯ মার্চ ২০২৬, ১০:৫৫ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

”স্মৃতির হাড়গোড়”

সিন-১:  বিকেলের নীরবতা

বিকেলের রোদটা যেন ক্লান্ত, যেন নিজেও দীর্ঘ দিনের ভারবহন করে শরীর ঢেলে দিচ্ছে। জানালার কাঁচ ভেদ করে ধুলোর কণাগুলো ঘরের মধ্যে ভাসছে, সোনালি আলোয় ঝিকমিক করছে।

আজহার সাহেব দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন পুরনো আলমারির সামনে। কাঠের ফাটল, উঠে যাওয়া রং-প্রতিটি ফাটল যেন তার নিজের বয়সের গল্প বলছে।

দীর্ঘ তিরিশ বছর পর তিনি আলমারির সবচেয়ে নিচের ড্রয়ারটা খুললেন। ড্রয়ার খুলতেই ন্যাপথলিনের তীব্র গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল। পুরনো কাগজের ঘ্রাণ, যা বছরগুলো ধরে ভেতরে আটকে ছিল, যেন তার অতীতকে হঠাৎ টেনে এনেছে। স্তূপের নিচে চাপা পড়ে ছিল একটি হলদেটে খাম। খামের ওপর নীল কালিতে লেখা একটি নাম-নাজিয়া। নামটি পড়তেই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেল। এই নামটি তিনি তিরিশ বছরে একবারও উচ্চারণ করেননি।

বাইরে আকাশে মেঘ জমছে। দূরের বজ্রনাদ ভেসে আসছে। আজহার সাহেবের আঙুল কাঁপছে। তিনি জানতেন-এই খাম খোলা মানে নিজের সাজানো জীবন ভেঙে পড়া। কিন্তু সত্যের স্বভাব অদ্ভুত। হাড়গোড়ের মতো চাপা পড়ে থাকা সত্য সবসময় বেরিয়ে আসে। তিনি ধীরে ধীরে খামটি খললেন।

সিন-২: চিঠির ভেতরের শব্দ (Flashback)

ভেতরে একটি ভাঁজ করা চিঠি। কাগজটি এত পুরনো যে ভাঁজ খুলতেই মনে হলো যেন শুকনো পাতার মতো ভেঙে যাবে। প্রথম লাইনটি পড়তেই বুক থেমে গেল:

“আজহার, যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌঁছায়, তাহলে বুঝবে আমি হয়তো আর বেঁচে নেই।”

শব্দগুলো সরাসরি তার হৃদয়ে আঘাত করল। তার চোখের সামনে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল এক অন্য সময়-১৯৭১।

তখন তিনি বাইশ বছরের তরুণ, চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন আর হৃদয়ে নাজিয়ার হাসি। জিয়া ছিল কলেজের সাহসী মেয়ে, যুদ্ধের সময়ে গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করত।

একদিন আজহার তাকে বলেছিল-

“নাজিয়া, তুমি এসব করো না। খুব বিপদ।” নাজিয়া হেসে বলেছিল- “দেশ যদি না বাঁচে, তাহলে আমাদের ভালোবাসা বাঁচবে কীভাবে?”

চিঠির পরের লাইনগুলো পড়তে পড়তে আজহার সাহেবের হাত কাঁপতে লাগল: “সেদিন রাতে আমরা খবর পেয়েছিলাম-কেউ একজন আমাদের আশ্রয়ের খবর দিয়ে দিয়েছে।”

তিনি জানতেন-সেই “কেউ একজন” তিনি নিজেই। এক বিকেলে তিনি তার পুরনো বন্ধু রাশেদকে বলেছিলেন-

“শুনছিস, নাজিয়ারা নাকি শহরের বাইরে পুরনো জুট মিলের কাছে লুকিয়ে আছে।” তিনি ভেবেছিলেন এটি সাধারণ কথা। কিন্তু রাশেদ ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর গুপ্তচর। সেই রাতেই হামলা হয়েছিল। আগুনে জ্বলছিল জুট মিলের গুদামঘর। চারদিকে গুলির শব্দ, চিৎকারে রাত কেঁপে উঠছিল। বাতাসে উড়ছিল নাজিয়ার সাদা ওড়না।

চিঠির শেষ অংশে লেখা ছিল:


“তোমাকে একটি কথা জানাতে চাই। আমার গর্ভে তোমার সন্তান আছে।”


আজহার সাহেবের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

চিঠির শেষ লাইনে লেখা:


“যদি তুমি সত্যিই আমাকে ভালোবেসে থাকো, একদিন সত্যটা বলো।

না হলে আমাদের হাড়গোড় শুধু মাটির নিচে থাকবে না- তোমার স্মৃতির ভেতরেও কাঁটা হয়ে থাকবে।”


সিন-৩: মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সত্য ।

পরদিন টাউন হলে অনুষ্ঠান। মঞ্চের পেছনে ঝোলানো লাল-সবুজ পতাকা।

ঘোষক বলল-


“এবার সম্মাননা প্রদান করব বীর মুক্তিযুদ্ধা আজহার উদ্দিন সাহেবকে।”


হলঘর করতালিতে ভরে উঠল। আজহার সাহেব ধীরে ধীরে মঞ্চে উঠলেন। তার হাতে তুলে দেওয়া হলো একটি সোনালি ক্রেস্ট। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন-

“আপনারা আমাকে সম্মান দিতে ডেকেছেন। কিন্তু আমি জানি না আমি এই সম্মানের যোগ্য কি না।”

হলঘর নিস্তব্ধ। তিনি পকেট থেকে সেই হলদেটে চিঠি বের করলেন।


“পঞ্চাশ বছর আগে আমি একটি ভুল করেছিলাম। আমি একজন বন্ধুকে বিশ্বাস করেছিলাম… আর সেই ভুলের কারণে অনেক মানুষ মারা গিয়েছিল।”


তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল।

“সেই মানুষদের মধ্যে একজন ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। আর সে আমার সন্তানের মা হতে যাচ্ছিল।”

পুরো হলঘর যেন পাথর হয়ে গেল। আজহার সাহেব ক্রেস্টটা টেবিলে রেখে দিলেন। “এই সম্মান আমি নিতে পারি না। কারণ সত্য লুকিয়ে রাখা মানে নিজের ভেতরে একটি কবর বানানো। আমার ভেতরে সেই কবর পঞ্চাশ বছর ধরে আছে।”

সিন-৪: শেষ সত্য ও প্রতীক

অনুষ্ঠানের কয়েকদিন পরে, তিনি খামের ভেতরে আরেকটি পাতলা কাগজ পেলেন।

কাগজে লেখা ছিল-


“আজহার, যদি তুমি সত্য বলো, আমি হয়তো দূর থেকে শুনতে পাবো। এবং যদি আমাদের সন্তান বেঁচে থাকে, আমি চাই সে জানুক-তার বাবা কখনো খারাপ মানুষ ছিল না।”


আজহার সাহেবের বুকের ভেতর শূন্য হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো-তার সন্তান হয়তো এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু তাকে চেনে না। সন্ধ্যার আকাশ পরিষ্কার। আজহার সাহেব উঠানে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। আমগাছের পাতাগুলো বাতাসে ধীরে ধীরে নড়ছিল।

মনে হলো-সময় নিজেই ফিসফিস করে বলছে:

“সব সত্য প্রকাশ পায় না। কিছু সত্য শুধু স্মৃতির মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকে।”

আজহার সাহেব চোখ বন্ধ করলেন। ঠোঁটে ধীরে ধীরে শান্ত হাসি ফুটে উঠল। পঞ্চাশ বছরের বোঝা অবশেষে মাটির ভেতরে নেমে গেছে।

Facebook Comments Box

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে: টিআইবি

বিএম কলেজে ‘মিটআপ উইথ শায়েখে চরমোনাই’ ও জুলাই স্মরণে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইয়াসের আয়োজনে বৈদারাপুরে সচেতনতামূলক সেমিনার

ফের ক্রেতার সাথে খারাপ ব্যবহার “জেমি কর্ণার’র কর্মচারীর

আগাছানাশক ‘প্যারাক কোয়াট’: বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ হলেও বাংলাদেশে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বাড়ছে প্রাণহানি:

প্রাণঝুঁকি আর মৃত্যুফাঁদে বসবাস করছে বিএম কলেজের ডিগ্রি হলের শিক্ষার্থীরা

আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিন আজ

আখড়াবাড়ি মন্দিরে জন্মাষ্টমির প্রস্তুতি সভায় সাংবাদিক অলোক শাহের ওপর হামলা

চট্টগ্রামে জাহাজভাঙা কারখানায় গ্যাস বিষক্রিয়ায় নিহত বেড়ে ৮

চেতনা বিক্রির রাজনীতি বাংলাদেশে আর হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১০

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষ্যে বরিশালে ১১ দলীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত

১১

জুলাই সনদ নিয়ে প্রতারণা করলে পরিণতি ভালো হবে না: ফয়জুল করীম

১২

ভোলায় স্কুলছাত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ-ভিডিও ধারণ, ৩ কিশোর গ্রেফতার

১৩

আমরা যদি বলি জুলাই কার, তাহলে জুলাই কারোই থাকবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১৪

ঝালকাঠিতে চোরের আঙুল কামড়ে বিচ্ছিন্ন করলেন গৃহবধূ

১৫

ছাত্রকে দিয়ে এইচএসসির খাতা মূল্যায়নের অভিযাগে শিক্ষক বরখাস্ত

১৬

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ, আহত অন্তত ১০

১৭

বিএম কলেজে নানা আয়োজনে পালিত হলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস

১৮

বিএম কলেজে “শিবির” ট্যাগ দিয়ে জুলাইয়ের অনুষ্ঠান বন্ধের অভিযোগ ছাত্রদলের বিরুদ্ধে

১৯

সরকারি বিএম কলেজ যুব রেড ক্রিসেন্টের অরিয়েন্টেশন ও নবীনবরণ অনুষ্ঠিত

২০

Discover more from বরিশাল পত্রিকা

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading