বরিশালের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের মহাত্মা অশ্বিনীকুমার ছাত্রাবাসের (ডিগ্রি হল) অবস্থা চরম জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে হলের ‘A’ ব্লকে প্রায় দেড়শো থেকে দুইশো শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। হলের প্রতিটি বারান্দার পলেস্তারা ও ইট এমন ভঙ্গুর অবস্থায় পৌঁছেছে যে, যেকোনো সময় ছাদ ধসে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিন তলাবিশিষ্ট ‘A’ ব্লক ভবনটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনের নিচতলার বিভিন্ন কক্ষের মেঝের মাটি নিচের দিকে ঢেবে গিয়ে অন্তত এক ফুট বা তারও বেশি গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দ্বিতীয় তলার বাথরুমগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী।
আজ রোববার (১৬ আগস্ট) দিনভর মুষলধারে বৃষ্টিতে তিন তলার ছাদ চুইয়ে সরাসরি কক্ষের ভেতরে পানি পড়তে শুরু করে। এতে শিক্ষার্থীদের বই-পুস্তক, তোশক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ যাবতীয় সরঞ্জাম পানিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছে। দুস্থ ও দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এখন চরম মানবেতর ও দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন।
কয়েক দিন আগেই এই ‘A ব্লকের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত ‘D’ ব্লকের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার একটি ভীতিকর ঘটনা ঘটে। এতে পড়ার টেবিলে পড়াশোনা করা অবস্থায় হিসাববিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্স শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম গুরুতর আহত হন। এ নিয়ে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে প্রশাসন ও বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়।
বিএম কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের চাপ দিলে এবং দায়িত্বশীলদের নিয়ে হল পরিদর্শনের পর ডিগ্রি হলের ডাইনিং সংস্কারের কাজ শুরু হলেও মূল আবাসিক কক্ষগুলোর বেহাল দশা নিরসনে কোনো উদ্যোগ নেওয়া এখনও হয়নি। উল্টো ডাইনিং সংস্কারের কাজ নিয়েও উঠেছে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ।
আজ রোববার দিনভর মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যেই ডাইনিংয়ের জলছাদের ঢালাইকাজ চালাতে দেখা যায়। এ সময় শিক্ষার্থীরা কাজে বাঁধা দিলে ঠিকাদারের সাইড কন্ট্রাক্টর ও শ্রমিকরা জানান সকালে যখন তারা কাজে এসেছিলেন তখন আবহাওয়া পরিষ্কার ছিল। বালু ও সিমেন্টের মিশ্রণ তৈরি করার পর বৃষ্টি শুরু হওয়ায় মালামাল নষ্ট হওয়ার ভয়ে তারা বৃষ্টির মধ্যেই ঢালাই দিতে বাধ্য হয়েছেন। পানির মধ্যে এ ধরনের ঢালাইয়ের স্থায়ীত্ব নিয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শিক্ষার্থীরা।
হলের জরাজীর্ণ অবস্থা ও টানা ছাদ চুইয়ে পানি পড়ার বিষয়ে হোস্টেল তত্ত্বাবধায়কের (হল সুপার) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব দায় চাপান শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ওপর। তিনি জানান, ভবনটির করুণ অবস্থা ও শিক্ষার্থীদের কষ্টের কথা একাধিকবার দায়িত্বশীলদের-কে চিঠি ও মৌখিকভাবে জানানো হলেও তারা কোনো দৃশ্যমান বা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
বরিশাল বিএম কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর ড. শেখ মোঃ তাজুল ইসলাম বলেন,
”আমরা বিষয়টি নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের এই করুণাময় ও দুর্বিষহ জীবনযাপনের চিত্র নিয়মিত শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হচ্ছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে তাদের কাছ থেকে এখনও আশানুরূপ বা দ্রুত পদক্ষেপ পাওয়া যাচ্ছে না।”
‘A’ ব্লকের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাইম ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন,
”আমরা প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছি। আমাদের জীবনের যেন কোনো মূল্যই নেই। যেকোনো মুহূর্তে ভবন ধসে বড় দুর্ঘটনা ঘটলে এই জীবনের নিশ্চয়তা কে দেবে? আমাদের কিছু হয়ে গেলে এই দায়ভার কি প্রশাসন নেবে? আমরা কলেজ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি, অনতিবিলম্বে আমাদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভবনটি দ্রুত সংস্কার বা বিকল্প আবাসন নিশ্চিত করা হোক।”