ডেস্ক রিপোর্ট
২৪ জুন ২০২৬, ৮:২৪ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

শুভ জন্মদিন লিও লিওনেল মেসি—অসীমের চিরবিস্ময়

আর্জেন্টিনার প্রধান রেলওয়ের প্রারম্ভিক স্টেশন রোজারিও। পারানা নদীর পশ্চিম তীরের এই শহরে ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন জন্ম নিল ভঙ্গুর শরীরের এক শিশু। ফুটবলের বর্ণিল ইতিহাসের সূচনা ওই জন্ম থেকেই। বলছি লিওনেল আন্দ্রেস মেসির কথা।

আজ ২৪ জুন, সেই রোজারিওর ছেলে লিওনেল মেসি পূর্ণ করছেন ৩৯ বছর। জন্মদিন এসেছে এমন মুহূর্তে, যখন উত্তর আমেরিকার মাটিতে চলছে বিশ্বকাপ, আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে মগ্ন। মেসি নিজেই এখানে লিখে চলেছেন রূপকথার আরও একটি অধ্যায়।

জন্মদিনের দুদিন আগে আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, মেসিকে বসিয়েছিল জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে। অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে জোড়া গোল দিয়ে ক্লোসাকে ছাড়িয়ে গেলেন, বসলেন এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে। ম্যাচে মিস করেছেন পেনাল্টি—২০১৮ সালে আইসল্যান্ড, ২০২২ সালে পোল্যান্ডের পর টানা তিন বিশ্বকাপে স্পটকিক থেকে গোল করতে ব্যর্থ। যা মেসিকে ঘানার আসামোয়াহ জিয়ানের ওপরে নিয়ে গেছে, অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের মালিক করেছে। এই বৈপরীত্যই বলে দেয়, মেসির গল্প সরলরেখার মতো নয়—এক হাতে ইতিহাস গড়া, অন্য হাতে মানবিক ব্যর্থতা মেনে নেওয়া।

রোজারিওর নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের মাঠে যে বালক বল নিয়ে দৌড়াত, তার শরীর বিশ্বাসঘাতকতা করছিল প্রতিভার সঙ্গে। গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়েছিল এগারো বছর বয়সে। রিভার প্লেট চিকিৎসার খরচ বহন করতে রাজি হয়নি। বার্সেলোনা এগিয়ে আসে। একটি ন্যাপকিনে লেখা চুক্তির গল্প আজ ফুটবল কিংবদন্তির মলাটে বাঁধা ইতিহাস।

বার্সেলোনার জার্সিতে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল, ১০ লা লিগা, ৪ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৭ কোপা দেল রে—মোট ৩৫ ট্রফি। উজ্জ্বল অধ্যায়ের ভেতরেই ছিল অন্ধকার ফাটল—জাতীয় দলের জার্সিতে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারার যন্ত্রণা। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ফাইনালেও একই পরিণতি। আর্জেন্টিনার মানুষ যখন তাকে ম্যারাডোনার ছায়ায় মাপতে শুরু করল, সেই ২০১৬ সালে ভাঙা হৃদয়ের মেসি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিলেন।

কিন্তু গল্পটা সেখানে থামেনি। নিজের ভেতরের স্বপ্নের অসমাপ্ত টানে মেসি ফিরলেন। ফেরাটা ছিল স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ জয়। সেই রাতে ফুটবল-ঈশ্বর যেন প্রিয় বান্দাকে অবশেষে প্রাপ্য মুকুট বুঝিয়ে দিলেন! গোল্ডেন বল হাতে, কালো বিশেষ পোশাকে শিরোপা উঁচিয়ে ধরা মেসির সেই ছবি আর্জেন্টাইনদের হৃদয়ের তিন যুগের ক্ষত শুকিয়ে দিয়েছিল এক নিমেষে।

এই মহাকাব্যিক যাত্রায় লিওনেল স্কালোনির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। একসময়ের সতীর্থ, পরে কোচ হওয়া স্কালেনিকে অস্ট্রিয়া ম্যাচের আগে মেসির জন্মদিন নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। জবাব ছিল সহজ অথচ গভীর—‘আমি চাই মেসি যেন সুখী থাকে, আমার মতো এটা দলের সবারই চাওয়া।’ মেসির স্বাভাবিক ছন্দে থাকা, দলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মাঝেই সুখ খুঁজে ফেরেন। মেসি সুখী থাকলে সাফল্যের পথটা মসৃণ হবে। মেসিকে সুখী রাখার জন্যই লড়ে গোটা দল! অস্ফুটে সত্যটা বলে দিলেন ২০০৬ বিশ্বকাপের সতীর্থ, প্রিয় বন্ধু এবং বর্তমান কোচ স্কালোনি।

পিএসজিতে দুই বছরের অধ্যায় মেসিসুলভ ছিল না—৭৫ ম্যাচে ৩২ গোল করে দলকে দুটি লিগ জেতাতে সহায়তা করেন। ২০২৩ সালে ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেওয়াটা ছিল রূপকথার পুনর্জন্ম। সূচনা লিগস কাপ জয় করে। তারপর এমএলএস সাপোর্টার্স শিল্ড, এমএলএস গোল্ডেন বুট, আর ২০২৫ সালে অবশেষে প্রথম এমএলএস কাপ শিরোপা। চলতি বছরের মার্চে ক্যারিয়ার গোল ৯০০ ছাড়িয়ে গেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে এ উচ্চতায় পা রাখা।

আট ব্যালন ডি’অর, ছয় ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুট, ক্লাব-আন্তর্জাতিক মিলিয়ে ৪৬ দলগত শিরোপা—ফুটবল ইতিহাসে এত সম্মান আর কারও ভাগ্যে আসেনি। সতীর্থদের দিয়ে করানো গোলসংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে, যা ফেরেঙ্ক পুসকাসকে টপকে যাওয়া কীর্তি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের মালিকের নামও কিন্তু মেসি। বিশ্বকাপের মঞ্চে তার নামের পাশে ১৮ গোল, টানা ছয় বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের বিরল কীর্তিও ঝুলছে। পরিসংখ্যানের উজ্জ্বল আলোর নিচে আছে মানবিক ছায়াও। স্পটকিকে সাফল্যের হার ৭৭ শতাংশের বেশি হলেও বিশ্বকাপে এই জায়গায় কেমন যেন বেসুরো তিনি। সর্বোচ্চ চাপের মঞ্চে মেসিই এখন সবচেয়ে বেশি পেনাল্টি মিসের মালিক—টানা তিনটি ভিন্ন আসরে। এই পরিসংখ্যান কিন্তু সমালোচনার নয়, বরং এটি প্রমাণপত্র যে, মেসিও রক্তমাংসের মানুষ। যিনি চাপের মুখে কাঁপেন, ভুল করেন; কিন্তু পরমুহূর্তেই ফিরে আসেন গোল করে, যেমনটা অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে করেছিলেন পেনাল্টি মিসের কয়েক মিনিট পরই।

আজকের পর মেসির বয়স হবে ৩৯। সর্বশেষ দুই ম্যাচ দেখিয়ে গেল—চোখে সেই একই ক্ষুধা, সেই একই শৈল্পিক প্রদর্শনী, যা তরুণ সতীর্থদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে দেয়। লাউতারো মার্তিনেজ, এনজো ফার্নান্দেজ, হুলিয়ান আলভারেজদের মতো নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি শুধু সতীর্থ নন, বরং জীবন্ত পাঠশালা।

Facebook Comments Box

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শুভ জন্মদিন লিও লিওনেল মেসি—অসীমের চিরবিস্ময়

বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়েছে যেসব দল

বাকেরগঞ্জে সহপাঠীর বডি স্প্রে’র গন্ধে অসুস্থ ১৪ শিক্ষার্থী

ববিতে লীগের সম্ভাব্য নাশকতা প্রতিহত করতে সক্রিয় ছাত্রদল, শিবিরের ভূমিকা নীরব

ঢাকাসহ ৬ জেলায় সেনা মোতায়েনের নির্দেশ

কে হচ্ছেন বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান

বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম গ্রেপ্তার

ঘুষ না পেয়ে মিথ্যা প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে

২২ লাখ শিক্ষার্থীর আসরে চ্যাম্পিয়ন বাকেরগঞ্জ

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থার বরিশাল জেলা সম্মেলন অনুষ্ঠিত

১০

ব্যাংক এশিয়ার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, কর্মস্থল ঢাকা

১১

যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ফিফাতে অভিযোগ ইরানের

১২

২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে ৪ শিশুর মৃত্যু

১৩

ফিফার পাওয়ার র‍্যাংকিংয়ের শীর্ষে মেসি

১৪

বরগুনায় ২৫ দিনে উদ্ধার ১৪ মরদেহ , জনমনে আতঙ্ক

১৫

বরিশালে মোটরসাইকেল-অটোরিকশা সংঘর্ষে প্রবাসী যুবক নিহত

১৬

অবশেষে পুলিশের জালে বরিশালের আলোচিত সন্ত্রাসী ‘দাও মাসুদ

১৭

বরিশালসহ ৫ বিভাগে চালু হচ্ছে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

১৮

বরিশালে অটো-থ্রি হুইলারে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি প্রদান

১৯

শ্বশুরবাড়ির এলাকায় চুরি করতে গিয়ে আটক জামাতা

২০