বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নগরী বরিশাল শহরের অদূরে অবস্থিত একটি ছোট্ট ইউনিয়নের নাম—চরমোনাই।“চরমোনাই” শব্দটি এতটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে যে, অনেকেই এটিকে কোনো ব্যক্তির নাম বলে ভুল করে থাকেন। অথচ বাস্তবে এটি বরিশাল সদর উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম, যা কালের বিবর্তনে আজ পরিণত হয়েছে এক আধ্যাত্মিক রাজধানীতে। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এই নামটি পরিচিত হয়ে উঠেছে মূলত এখানকার পীর সাহেব ও আধ্যাত্মিক ধারার কারণে।এই চরমোনাই দরবার শরীফকে ঘিরেই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক চরমোনাই বার্ষিক মাহফিল—যা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী গণজমায়েত হিসেবে স্বীকৃত।
সূচনা ও প্রতিষ্ঠাতা: এক আধ্যাত্মিক ভিত্তির নির্মাণ
চরমোনাই দরবার শরীফের সূচনা ঘটে মহান বুযুর্গ মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক (রহ.)-এর হাত ধরে। তিনি ছিলেন একজন আল্লাহভীরু, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তিনিই এই এলাকায় একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনি মারকাজ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। শুরুতে এই মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করেই একটি ছোট পরিসরের বার্ষিক মাহফিল অনুষ্ঠিত হতো।
ঐতিহাসিকভাবে ধারণা করা হয়, আনুমানিক ১৯২৪ সালে এই মাহফিলের সূচনা হয়। সেই ছোট্ট আয়োজনই আজ শতবর্ষ পেরিয়ে এক বিশাল ইসলামী সমাবেশে পরিণত হয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো—প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত এই মাহফিল কখনো বন্ধ হয়নি; বরং নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ক্রমাগত বিস্তৃত হয়েছে। মাওলানা ইসহাক (রহ.) ছিলেন ক্বারি ইব্রাহিম (রহ.)-এর খাস ছাত্র ও খলিফা।
আর ক্বারি ইব্রাহিম (রহ.) ছিলেন ভারতের বিখ্যাত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক
মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী (রহ.)-এর খলিফা। এই সিলসিলার ধারাবাহিকতা চরমোনাই দরবারকে একটি সুদৃঢ় আধ্যাত্মিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ধারাবাহিক নেতৃত্ব: উত্তরাধিকার ও বিকাশ
প্রতিষ্ঠাতার ইন্তেকালের পর এই দরবারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন মাওলানা সৈয়দ ফজলুল করীম (রহ.)। তাঁর যুগে চরমোনাই মাহফিল দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করে এবং লাখো মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। তাঁর বয়ান, দিকনির্দেশনা ও নেতৃত্ব অসংখ্য মানুষকে ইসলামের পথে ফিরিয়ে এনেছে। বর্তমানে এই দরবার পরিচালিত হচ্ছে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম-এর নেতৃত্বে, যিনি “আমিরুল মুজাহিদিন” হিসেবে পরিচিত। তাঁর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম, যিনি “নায়েবে আমিরুল মুজাহিদিন”।
দুইটি ঐতিহ্যবাহী মাহফিল ও ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপট
চরমোনাই দরবারে প্রতি বছর দুটি বড় মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়—
* একটি বাংলা অগ্রহায়ণ মাসে
* অপরটি ফাল্গুন মাসে
এই দুই মাহফিলকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মানুষ অংশগ্রহণ করে। তবে ২০২৬ সালে ফাল্গুনের নির্ধারিত মাহফিলটি পবিত্র রমজান মাসের মধ্যেই পড়ে যাওয়ায়, এবং জাতীয় নির্বাচনের বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সময় পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে এবারের মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে— ০১, ০২ ও ০৩ এপ্রিল ২০২৬।আখেরি মোনাজাত: শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬ সকালে
সাতটি তরিকার বয়ান: আধ্যাত্মিক শিক্ষার মূলধারা
চরমোনাই মাহফিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে ধারাবাহিকভাবে ৭টি তরিকার বয়ান করা হয়। এর মধ্যে— ৫টি বয়ান করেন :- বর্তমান পীর সাহেব মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম। ২টি বয়ান করেন বর্তমান নায়েবে আমীর সাহেব মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম। এই বয়ানগুলো মানুষের আত্মিক উন্নয়ন, নফসের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে।
আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন
চরমোনাই মাহফিল আজ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বরেণ্য আলেম ও ইসলামিক স্কলারগণ এতে অংশগ্রহণ করেন।বিশেষ করে—ভারত,পাকিস্তান,সৌদি আরব,সংযুক্ত আরব আমিরাত,মিশর থেকে শীর্ষ আলেমরা উপস্থিত হন। ভারতের ঐতিহ্যবাহী দারুল উলুম দেওবন্দ এর আলেমদের একটি বড় অংশ নিয়মিতভাবে এই মাহফিলে অংশগ্রহণ করেন।
ছোট মাঠ থেকে বিশাল সমাবেশ
চরমোনাই মাহফিলের শুরু হয়েছিল একটি ছোট্ট মাঠে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে অবিশ্বাস্যভাবে। বর্তমানে এই মাহফিল ৬টি বিশাল মাঠ জুড়ে অনুষ্ঠিত হয়, যার মোট আয়তন প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটার। এই বিশাল এলাকাজুড়ে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে।
মাহফিলকে ঘিরে চরমোনাই ইউনিয়নসহ আশেপাশের ইউনিয়নগুলোতে সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব জনসমুদ্র। ধারণা করা হয়, ফাল্গুনের মাহফিলে প্রায় ১ কোটির মতো মানুষের সমাগম ঘটে থাকে।
দলমত নির্বিশেষে অংশগ্রহণ
চরমোনাই মাহফিলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিভাজন নেই।
চরমোনাইর পীর সাহেবের ভক্ত ও অনুসারীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিভিন্ন মত ও পথের মানুষ এই মাহফিলে অংশ নেয়। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ এখানে এসে একত্রিত হয় শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে।
বয়ান: হৃদয় জাগানো দাওয়াত
দেশ-বিদেশের বরেণ্য আলেমগণ মাহফিলে ইসলামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বয়ান করেন। তাদের বক্তব্য হয়—* হৃদয়গ্রাহী
* যুক্তিনির্ভর * বাস্তবমুখী।এই বয়ান মানুষের চিন্তা-চেতনায় গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাদের জীবন পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জোগায়।
আখেরি মোনাজাত: অশ্রুসিক্ত এক মহামুহূর্ত
মাহফিলের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো আখেরি মোনাজাত, যা অনুষ্ঠিত হবে শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬ সকালে। এই মোনাজাত পরিচালনা করবেন মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম।
তাঁর কণ্ঠে দোয়ার আবেদন, বিনয় ও ভালোবাসা লাখো মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে। এই সময় চারদিকে কান্নার সুর, তওবার আহ্বান—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ।
সমাজে প্রভাব: এক নৈতিক জাগরণ
চরমোনাই মাহফিল শুধু একটি সমাবেশ নয়; এটি একটি পরিবর্তনের মাধ্যম—* মানুষ নামাজে নিয়মিত হয় * গুনাহ থেকে ফিরে আসে * তরুণদের মধ্যে দ্বীনের আগ্রহ বাড়ে * পরিবারে ইসলামী পরিবেশ গড়ে ওঠে। পরিশেষে বলতে চাই, এক শতাব্দীর ঐতিহ্য, আজকের অনুপ্রেরণা প্রায় একশত বছরেরও বেশি সময় ধরে চরমোনাই মাহফিল একটি আধ্যাত্মিক আন্দোলন হিসেবে নিজস্ব অবস্থান ধরে রেখেছে। ছোট্ট একটি মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিল থেকে শুরু হয়ে এটি আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইসলামী গণজমায়েতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ ইসহাক (রহ.) থেকে বর্তমান নেতৃত্ব মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতা আজও অব্যাহত রয়েছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মাহফিলের শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক, কলাম লেখক ও গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় ইসলামী গবেষণা সেন্টার