বাংলাদেশ ভৌগোলিক কারণেই দুর্যোগপ্রবণ। প্রতিবছর মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং নদীভাঙন আমাদের অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করে। হাজার হাজার একর ফসলি জমি বিলীন হয়, মানুষ ভিটেমাটি হারিয়ে শহরমুখী হয়। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি যদি দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হয়, তবে আমাদের গতানুগতিক অবকাঠামো চিন্তার বাইরে এসে ‘মহা-পরিকল্পনা’ গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমানে দেশের সম্পূর্ণ মানচিত্র ঘেঁষে—অর্থাৎ নদী, জলাশয় ও অববাহিকাগুলোর সীমানা রক্ষা করে কমপক্ষে ২০ ফুট উচ্চতার শক্তিশালী বেড়িবাঁধ এবং তার ওপর ১০০ ফুট চওড়া আধুনিক সড়ক নির্মাণ এখন সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়, বরং এটি হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি নতুন লাইফলাইন।
**বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষকের সুরক্ষা**
আমাদের দেশে প্রতিবছর বন্যায় কয়েক হাজার কোটি টাকার ফসল ও গবাদিপশু নষ্ট হয়। ২০ ফুট উচ্চতার একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক বেড়িবাঁধ কেবল পানিই আটকাবে না, এটি নদীভাঙন রোধে একটি স্থায়ী বর্ম হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে কৃষকের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা টেকসই হবে।
**যোগাযোগ বিপ্লব ও অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ**
একটি দেশের রাজধানীর ওপর চাপ তখনই কমে, যখন প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের কাছে সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে যায়। ১০০ ফুট চওড়া একটি আধুনিক সড়ক যদি সারা দেশের মানচিত্রকে সংযুক্ত করে, তবে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থায় অভাবনীয় বিপ্লব ঘটবে। দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে পণ্য সরাসরি বন্দরে বা শিল্পাঞ্চলে পৌঁছাতে সময় কম লাগবে। এর ফলে ঢাকার বাইরে নতুন নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে, যা রাজধানীমুখী জনস্রোত কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
**ব্লু-ইকোনমি ও পর্যটনের প্রসার**
এই বাঁধ ও সড়ক ব্যবস্থা কেবল যাতায়াতের মাধ্যম হবে না; এর দুই পাশে পরিকল্পিত বনায়ন এবং জলাশয় রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে আমাদের বাস্তুসংস্থান রক্ষা করা সম্ভব। বিশেষ করে উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলে এই অবকাঠামো পর্যটন শিল্পের এক বিশাল দুয়ার খুলে দিতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এটি গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনে শক্তিশালী হাতিয়ার হবে।
**নাগরিকবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থা**
রাষ্ট্রের যেকোনো উন্নয়ন তখনই স্বার্থক হয় যখন তার সুফল সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে ভোগ করতে পারে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সাধারণ মানুষের ওপর যেন অতিরিক্ত করের বোঝা চেপে না বসে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। ভ্যাট ও করব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী এবং নাগরিকবান্ধব করা প্রয়োজন। দেশের উন্নয়ন যেন সাধারণের পকেট কাটার কারণ না হয়ে বরং তাদের আয় বৃদ্ধির সহায়ক হয়, সেটিই কাম্য।
উন্নয়ন হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক। রাজধানীর জৌলুস যেমন উন্নয়ন, তেমনি কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল বা সাতক্ষীরার উপকূলীয় মানুষের জানমালের নিরাপত্তাও উন্নয়নের অংশ। পরিকল্পিত উন্নয়ন, সমন্বিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সমান নাগরিক সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে সমগ্র বাংলাদেশই একটি আধুনিক, সংযুক্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে। সরকারের নীতি-নির্ধারকরা এই সমন্বিত পরিকল্পনার গুরুত্ব অনুধাবন করবেন—এমনটিই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক:
মাহমুদ খান
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।